খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি ২০২৬
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে এক ইতিবাচক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে। দীর্ঘদিনের ডলার সংকট কাটিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন বাজার থেকে ডলার ক্রয়ের মাধ্যমে রিজার্ভ শক্তিশালী করার পথে হাঁটছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক আন্তঃব্যাংক বাজার থেকে মোট ৩.৯৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্রয় করেছে। ডলারের সরবরাহ বৃদ্ধি এবং প্রবাসী আয় ও রপ্তানি আয়ের ইতিবাচক প্রবাহ এই হস্তক্ষেপকে ত্বরান্বিত করেছে।
আজ পাঁচটি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৫৫ মিলিয়ন ডলার ক্রয় করেছে। এই লেনদেনে প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল ১২২.৩০ টাকা, যা বর্তমানে ‘কাট-অফ’ রেট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। শুধুমাত্র ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার ক্রয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৯৮ মিলিয়ন ডলারে। গত কয়েক মাস ধরে আমদানির চাপ কমে আসা এবং বাজারে ডলারের পর্যাপ্ততা বৃদ্ধির ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।
নিচে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সাম্প্রতিক লেনদেনের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হলো:
সারণি: বৈদেশিক মুদ্রার বাজার ও রিজার্ভের বর্তমান চিত্র (জানুয়ারি ২০২৬)
| সূচকের বিবরণ | তথ্য ও পরিসংখ্যান |
| চলতি অর্থবছরে মোট ডলার ক্রয় | ৩.৯৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার |
| জানুয়ারি ২০২৬-এ এককভাবে ক্রয় | ৭৯৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার |
| বর্তমান বিনিময় হার (কাট-অফ রেট) | ১২২.৩০ টাকা (প্রতি ডলার) |
| মোট গ্রস রিজার্ভ (২২ জানুয়ারি) | ৩২.৬৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার |
| রিজার্ভ (BPM6 পদ্ধতি অনুযায়ী) | ২৮.০৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার |
বিগত ২০২১ থেকে ২০২৫ অর্থবছরের মধ্যে জ্বালানি তেল, সার এবং খাদ্যশস্য আমদানির ব্যয় মেটাতে বাংলাদেশ ব্যাংককে তার রিজার্ভ থেকে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিক্রি করতে হয়েছিল। এর ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুদের ওপর চরম চাপ সৃষ্টি হয়। তবে চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই চিত্রটি বদলাতে শুরু করে। রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের উচ্চ প্রবাহের ফলে বাজারে ডলারের সরবরাহ বেড়েছে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ডলার বিক্রির বদলে ক্রয়ের সুযোগ করে দিয়েছে।
জুলাই মাসের শুরু থেকেই মার্কিন ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশি টাকার মান শক্তিশালী হতে দেখা গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই ডলার ক্রয় মূলত দুটি উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে: প্রথমত, ডলারের অতিরিক্ত সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে টাকার মানকে একটি স্থিতিশীল পর্যায়ে রাখা এবং দ্বিতীয়ত, আইএমএফ-এর শর্ত অনুযায়ী নিট রিজার্ভের পরিমাণ বৃদ্ধি করা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে আমদানিকারকদের জন্য স্বস্তি বয়ে আনবে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ‘BPM6’ ম্যানুয়াল অনুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশের রিজার্ভ ২৮.০৬ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে, যা দেশের বহিঃস্থ খাতের সক্ষমতার প্রতিফলন। রিজার্ভের এই ধারাবাহিক বৃদ্ধি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে এবং আমদানির ঋণপত্র (LC) খোলার ক্ষেত্রে জটিলতা হ্রাস পাবে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, যদি রেমিট্যান্সের এই ধারা অব্যাহত থাকে এবং রপ্তানি আয় লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী অর্জিত হয়, তবে অর্থবছর শেষে রিজার্ভের পরিমাণ আরও সন্তোষজনক পর্যায়ে পৌঁছাবে। বাংলাদেশ ব্যাংক পরিস্থিতি অনুযায়ী তাদের এই বাজার হস্তক্ষেপ বা ‘ইন্টারভেনশন’ জারি রাখবে বলে ব্যাংক কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে।