খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫
রাজধানীর একটি হাসপাতালে সুস্থ সন্তান জন্ম দেওয়ার পর এক মা অসুস্থ হয়ে পড়লে নবজাতককে কয়েক দিন হাসপাতালে থাকতে হয়। আর এই সময়ই নবজাতকের জন্য মারাত্মক প্রমাণিত হয়। ছত্রাকের ভয়াবহ সংক্রমণের কারণে জন্মের কয়েক দিনের মধ্যেই নবজাতকের জীবনাবসান ঘটে।
চিকিৎসকদের প্রাণপণ চেষ্টা সত্ত্বেও তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি, কারণ হাসপাতালের বিছানা থেকে এমন ভয়াবহ ছত্রাক সংক্রমণ ঘটতে পারে, তা ছিল তাদের ধারণার বাইরে। শুধু তাই নয়, দেশের হাসপাতালগুলোতে ছত্রাক সংক্রমণ নির্ণয়েরও কোনো ব্যবস্থা নেই। বিশেষ করে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) এই সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি, যা রোগীদের মৃত্যুর অন্যতম কারণ।
আন্তর্জাতিক উদারাময় গবেষণা কেন্দ্র (আইসিডিডিআর,বি)-এর একদল গবেষক দেশে প্রথমবারের মতো হাসপাতাল-ভিত্তিক ভয়ানক ছত্রাক সংক্রমণের ওপর গবেষণা চালাচ্ছেন। ২০২২ সালের জুলাই মাস থেকে ঢাকার দুটি বড় ও বিশেষায়িত হাসপাতালের ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে এই গবেষণা চলছে।
এই গবেষণার অংশ হিসেবে ছত্রাক সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকা ৯৯২ জন রোগীকে তালিকাভুক্ত করা হয়। এই অনুসন্ধান থেকে দেখা যায় যে, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রগুলোতে প্রাপ্তবয়স্ক, নবজাতক এবং শিশুদের মধ্যে প্রাণঘাতী ছত্রাক সংক্রমণের হার অনেক বেশি।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে যে, দেশে সিস্টেমিক ছত্রাক সংক্রমণের নিয়মিত কোনো নজরদারি ব্যবস্থা না থাকায় এর আগে এই ধরনের প্রাণঘাতী ছত্রাক চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ছত্রাক সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকি চিহ্নিত হয়েছে এবং ক্যান্ডিডা অরিস ও ক্যান্ডিডা ব্ল্যাঙ্কি নামের দুটি ছত্রাক ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে ছত্রাক প্রতিরোধী ফ্লুকোনাজোল, ভোরিকোনাজোলের মতো ওষুধগুলো তাদের কার্যকারিতা হারাচ্ছে। তবে ক্যাসপোফাঙ্গিন, মাইকাফাঙ্গিনের মতো কিছু ওষুধ কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে। যদিও এই ওষুধগুলো সহজলভ্য নয় এবং অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
গবেষণায় আরও তথ্য মিলেছে যে, দেশে বছরে প্রায় ৩০ হাজার ১৭৮ জন দীর্ঘস্থায়ী পালমোনারি অ্যাসপারগিলোসিস (শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে সংক্রমিত) রোগে আক্রান্ত হন, যাদের ৮০ শতাংশই যক্ষ্মা রোগী। আরও ৯০ হাজার ২৬২ জন অ্যালার্জিক ব্রঙ্কোপালমোনারি অ্যাসপারগিলোসিসে সংক্রমিত হন। এছাড়া, ৮ হাজার ১০০ জন ক্যান্ডিডা ছত্রাকের মাধ্যমে রক্তপ্রবাহে সংক্রমণের শিকার হন, যা প্রতি লাখে পাঁচজন।
পাশাপাশি, ৫ হাজার ১৬৬ জন আক্রমণাত্মক অ্যাসপারগিলোসিস সংক্রমণের শিকার হন, যারা মূলত ফুসফুসের মারাত্মক সংক্রমণ এবং ফুসফুস ক্যান্সারে ভুগছিলেন। বাংলাদেশে ছত্রাক সংক্রমণের প্রধান কারণ হলো ক্যান্ডিডা ব্ল্যাঙ্কি, যা মোট সংক্রমণের ৪৬.৫ শতাংশ।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ছত্রাক সংক্রমণের চিত্র আরও ভয়াবহ। প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ৬৫ লক্ষ মানুষ ছত্রাক সংক্রমণের শিকার হন। এর মধ্যে ৩৮ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয় এবং এর মধ্যে ২৫ লক্ষ মানুষের মৃত্যু শুধুমাত্র ছত্রাক সংক্রমণের কারণেই ঘটে।
গবেষকরা বলছেন, এই বিপদ থেকে বাঁচতে হলে মাইক্রোবায়োলজিক্যাল প্রমাণের ভিত্তিতে অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে, যে ওষুধগুলো এখনও কার্যকর, সেগুলোও সময়ের সঙ্গে কার্যকারিতা হারাবে। এছাড়াও, অ্যান্টিবায়োটিকের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে, কারণ এর অত্যধিক ব্যবহার ছত্রাক সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ব্যাকটেরিয়া এবং ভাইরাসের তুলনায় ছত্রাক সংক্রমণ প্রায়ই অবহেলিত হয়। সময় মতো নির্ণয় এবং চিকিৎসা না হলে এই সংক্রমণগুলো দ্রুতই ভয়ংকর রূপ নিতে পারে। ওষুধ প্রতিরোধী ছত্রাক একটি উদীয়মান বৈশ্বিক স্বাস্থ্য হুমকি, যা সম্প্রতি বাংলাদেশেও শনাক্ত হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে থাকা রোগীদের রক্তপ্রবাহে ছত্রাক সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই সংক্রমণগুলো ধরা পড়ে না বা দেরিতে শনাক্ত হয়, যার ফলে প্রতিরোধ করা যায় এমন সংক্রমণেই অনেক মানুষের মৃত্যু ঘটে।
গবেষণায় ক্যান্ডিডা অরিস এবং ক্যান্ডিডা ব্ল্যাঙ্কির মতো ভয়ংকর ছত্রাকও চিহ্নিত হয়েছে। ক্যান্ডিডা অরিস রক্তপ্রবাহের সংক্রমণে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে ৮০ থেকে ১০০ শতাংশ মৃত্যুর কারণ হতে পারে। গবেষকদের মতে, এই ধরনের সংক্রমণের ক্ষেত্রে দ্রুত রোগ নির্ণয় এবং শক্তিশালী সংক্রমণ প্রতিরোধের ব্যবস্থা জীবন বাঁচাতে পারে। ফ্লুকোনাজোলের মতো সাধারণ অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধগুলো এই ছত্রাকগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকারিতা হারাতে বসেছে। তবে মাইকাফাঙ্গিন এবং ক্যাস্পোফাঙ্গিনের মতো কিছু ব্যয়বহুল এবং দুষ্প্রাপ্য ওষুধ এখনও কার্যকর ভূমিকা পালন করছে।
এই গবেষণার প্রধান গবেষক, আইসিডিডিআর,বি-র সিনিয়র রিসার্চ ইনভেস্টিগেটর ড. তানজির আহমেদ শুভ বলেন, ‘দেশে এর আগে ছত্রাকের সংক্রমণ নিয়ে কোনো গবেষণা ছিল না। তাই এর ভয়াবহতা সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণা ছিল না। আমরা গবেষণায় দেখতে পেলাম যে ব্যাকটেরিয়ার মতো ছত্রাকও ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে। সাধারণ ওষুধ এবং জীবাণুনাশক এই ছত্রাকগুলোর বিরুদ্ধে যথেষ্ট সক্রিয় নয়। এক্ষেত্রে জরুরিভিত্তিতে সংক্রমণ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। অন্যথায় ছত্রাক সংক্রমণ মারাত্মক রূপ নিতে পারে।’
ছত্রাক একটি বহুকোষী অণুজীব, যা মানুষ, প্রাণী এবং উদ্ভিদের মধ্যে রোগ সৃষ্টি করতে পারে। সাধারণত পৃষ্ঠীয় সংক্রমণ, মুখের থ্রাশ, রিংওয়ার্ম এবং অনাইকোমাইকোসিস ইত্যাদির মাধ্যমে ছত্রাকের সংক্রমণ হয়। আক্রমণাত্মক বা সিস্টেমিক ছত্রাক সংক্রমণ; ক্রিপ্টোকক্কাল মেনিনজাইটিস; দীর্ঘস্থায়ী পালমোনারি অ্যাসপারগিলোসিস; নিউমোসিস্টিস নিউমোনিয়া ইত্যাদি হলো ছত্রাকের প্রধান সংক্রমণ।
খবরওয়ালা/টিএসএন