কুষ্টিয়া প্রতিনিধি
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৭ জুন ২০২৫
কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার বহলবাড়িয়া ইউনিয়নে বাজারের একেবারে মাঝখানে গড়ে উঠেছে বালুর স্তূপ। আর সেই বালু ব্যবহৃত হচ্ছে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে, যা ঘিরে জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাদের ছত্রছায়ায় এই অবৈধ বালু ব্যবসা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে।
জানা গেছে, গত ৩ মার্চ কুষ্টিয়া সুগার মিলস লিমিটেডের মালিকানাধীন বহলবাড়িয়া ইক্ষু ক্রয় কেন্দ্রের ০.৬৬ একর জমি টেন্ডারের মাধ্যমে দুই বছরের জন্য লিজ নেয় টেক্সট ওয়ার্ল্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি ৭৭,১৩৫ টাকায় জমির লিজ লাভ করে।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, লিজগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের মালিক ফেরদৌস ওয়াহিদ খান রাসেল—যিনি মিরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক—ও স্থানীয় বিএনপির কিছু নেতাকর্মী মিলে ওই জমিতে বালু স্তূপ করে তা ড্রাম ট্রাক ও ট্রলির মাধ্যমে বিক্রি করছেন। ফলে বাজার এলাকার জনজীবন, বিশেষ করে শিক্ষার্থী, দোকানি ও পথচারীদের চলাচলে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটছে।
বহলবাড়িয়া বাজারসংলগ্ন অন্তত পাঁচটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন ধুলা, ট্রাকের শব্দ ও দুর্গম চলাচলের মধ্য দিয়ে যাতায়াত করছে। সরু রাস্তায় বালিবাহী ট্রাক ও ট্রলি চলাচলের কারণে বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বহলবাড়িয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক জানান, বিদ্যালয়ের সামনেই বালুর স্তূপ রেখে দেওয়া হয়েছে, যা “অমানবিক ও ঝুঁকিপূর্ণ”। প্রতিদিনই শিক্ষার্থীরা ধুলাবালির মধ্যে স্কুলে যাতায়াত করছে এবং অনেকেই শ্বাসকষ্ট, চুলকানি ও চোখের সমস্যা নিয়ে ভুগছে। এমনকি ধুলোর কারণে শ্রেণিকক্ষে জানালা খুলে ক্লাস নেওয়াও কঠিন হয়ে উঠেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষকরা।
এক দোকানদার বলেন, ‘স্কুল শুরুর সময় ও ছুটির সময়ে সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয়। ট্রাক থেকে বালু খালাসের সময় ধুলায় দম বন্ধ হয়ে আসে। শিশুদের জন্য এটা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরও এক দোকানদার জানান, অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার মেলেনি। বরং দিন দিন বালুর স্তূপ আরও বড় হচ্ছে।
এ বিষয়ে টেক্সট ওয়ার্ল্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড–এর প্রোপাইটার ফেরদৌস ওয়াহিদ খান রাসেল বলেন, ‘বহলবাড়িয়া ইক্ষু ক্রয় কেন্দ্র জমিতে বালি ফেলা বা বাণিজ্যিক বালু বিক্রির বিষয়ে আমি কিছু জানি না। বর্তমানে ওই এলাকার ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতাকর্মী আমার অনুপস্থিতিতে জমিটি দখল করে তাদের মতো করে ব্যবহার করছে।’ তিনি আরও জানান, ‘আমি তাদের কোনো অনুমতি দিইনি। আমি চাই, দ্রুত বালুর স্তূপ অপসারণ করে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার উপযোগী পরিবেশ ফিরিয়ে আনা হোক।’
কুষ্টিয়া সুগার মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোছা. সালমা আক্তার জানান, জমিতে বালু স্তূপ করে বাণিজ্য চালানো হচ্ছে—এ বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না। এখন আপনাদের কাছ থেকে জানতে পারলাম। পরিবেশ দূষণ হয় এমন কাজ আমরা হতে দেব না। দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘বাজারের মাঝখানে বালু বিক্রির বিষয়ে এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে কেউ অভিযোগ করেনি। অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এলাকার সাধারণ মানুষ ও অভিভাবকদের দাবি, ‘এ ধরনের অনিয়ম ও ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রম বাজারের ভেতরে জনস্বার্থের পরিপন্থি। এটি নিরাপত্তাহীনতার পাশাপাশি জনজীবন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটাচ্ছে।’
তারা স্থানীয় প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন, অবিলম্বে বাজার এলাকার বালু অপসারণ করে জনসাধারণ ও শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত ও সচল পরিবেশ নিশ্চিত করা হোক।
খবরওয়ালা/আরডি