রাজধানীর বেইলি রোডের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৪৬ জনের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় অভিযুক্ত এক রেস্টুরেন্ট মালিক আবারও আদালতে আত্মসমর্পণের আবেদন করে তা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। মামলার অন্যতম আসামি রাফি উজ-জাহেদ (৩৪) রবিবার ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. সেফাতুল্লাহর আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করেছিলেন। তবে শুনানি শেষে আদালতের আদেশের অপেক্ষার মধ্যে তাঁর পক্ষ থেকে আবেদন প্রত্যাহার করা হয়।
আদালত সূত্রে জানা যায়, রাফির পক্ষে আইনজীবী এবিএম ইব্রাহিম খলিল জামিনের আবেদন উপস্থাপন করেন। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর মুহাম্মদ শামছুদ্দোহা সুমন জামিনের বিরোধিতা করে আদালতে যুক্তি তুলে ধরেন। উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার পর আদালত আদেশের জন্য বিষয়টি অপেক্ষমাণ রাখেন।
পরবর্তীতে ঘটনাটি ঘিরে বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। প্রসিকিউটর শামছুদ্দোহা সুমনের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে তাঁকে জানানো হয়েছিল যে আদালত জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে আসামিকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। সেই তথ্য তিনি বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মীকেও অবহিত করেন। কিন্তু পরে সাধারণ নিবন্ধন শাখা থেকে তাঁকে জানানো হয়, আসামিপক্ষ আত্মসমর্পণ ও জামিন-সংক্রান্ত আবেদন প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এতে পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
এটি প্রথমবার নয়। আদালত-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, একই মামলায় গত ২৩ মে রাফি উজ-জাহেদ আত্মসমর্পণের আবেদন করে পরে তা প্রত্যাহার করেন। এরও আগে ২০ ও ২১ মে তিনি একই ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। অর্থাৎ অল্প সময়ের ব্যবধানে একাধিকবার আত্মসমর্পণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রতিবারই তা শেষ পর্যন্ত প্রত্যাহার করা হয়েছে।
একই মামলায় গত ১৭ মে ভবনটির মালিকানা-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী রমজানুল হক নিহাদ এবং একটি রেস্টুরেন্টের স্বত্বাধিকারী আদিব আলম আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করেন। পরে নিহাদ তাঁর আবেদন প্রত্যাহার করলেও আদিব আলম আদালত থেকে জামিন লাভ করেন।
অগ্নিকাণ্ড-সংক্রান্ত মামলার অগ্রগতি অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৯ এপ্রিল আদালত ২২ জন আসামির বিরুদ্ধে দাখিল করা অভিযোগপত্র আমলে গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে পলাতক ১৩ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। এর আগে ২ এপ্রিল তদন্ত শেষ করে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)-এর পরিদর্শক শাহজালাল মুন্সী আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন।
অগ্নিকাণ্ডের সংক্ষিপ্ত বিবরণ
| বিষয় |
তথ্য |
| ঘটনার তারিখ |
২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ |
| ঘটনার সময় |
রাত প্রায় ৯টা ৪৫ মিনিট |
| স্থান |
গ্রিন কোজি কটেজ, বেইলি রোড, ঢাকা |
| ভবনের ধরন |
সাততলা বাণিজ্যিক ভবন |
| নিহত |
৪৬ জন |
| পুরুষ নিহত |
২০ জন |
| নারী নিহত |
১৮ জন |
| শিশু নিহত |
৮ জন |
| জীবিত উদ্ধার |
৭৫ জন |
| অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি |
২২ জন |
২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজ নামের সাততলা ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। দ্রুত ছড়িয়ে পড়া আগুনে ভবনের বিভিন্ন তলায় অবস্থানরত মানুষ বের হওয়ার সুযোগ পাননি। এতে ৪৬ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে এবং বহু মানুষ আহত হন। নিহতদের মধ্যে পুরুষ, নারী ও শিশু—সব বয়সী মানুষ ছিলেন। ঘটনাটি দেশের সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় নগর অগ্নিকাণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়।
এই ঘটনায় রমনা মডেল থানার উপপরিদর্শক মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম মামলা দায়ের করেন। প্রাথমিকভাবে থানা পুলিশ তদন্ত শুরু করলেও পরবর্তীতে মামলাটির তদন্তভার সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ভবন পরিচালনা, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, ব্যবসা পরিচালনার অনুমোদন এবং দায়িত্বে অবহেলার বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। বর্তমানে মামলাটি বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে এবং পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।