খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 1শে অগ্রহায়ণ ১৪৩২ | ১৫ই নভেম্বর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ককে কেন্দ্র করে দুই বন্ধুর দ্বন্দ্বের জেরে ব্যবসায়ী আশরাফুল হককে হত্যার পর মরদেহ দা দিয়ে ২৬ টুকরো করা হয়। এরপর হাইকোর্টসংলগ্ন জাতীয় ঈদগাহ মাঠের কাছে নীল রঙের দুটি ড্রামে ভরে রাখা হয়। এ ঘটনায় জড়িত অভিযোগে আশরাফুলের বন্ধু জারেজুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। শুক্রবার (১৪ নভেম্বর) রাতে কুমিল্লার দাউদকান্দি এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে জারেজুল ও তার সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে থাকা শামীমা লাশ একই বাসায় ২৪ ঘণ্টার বেশি রেখে পরিকল্পনা করে কীভাবে লুকানো হবে। পরে তারা সিদ্ধান্ত নেয় মরদেহ টুকরো করে ড্রামে ভরে ফেলবে। সে অনুযায়ী দা দিয়ে ২৬ টুকরো করে হাইকোর্টের সামনে ওই ড্রাম রেখে আসে।
ব্যবসায়ী আশরাফুল হত্যার ঘটনায় জারেজুলের প্রেমিকা শামীমাকেও বিভিন্ন আলামতসহ গ্রেপ্তার করেছে র্যাব-৩।
তদন্তসংশ্লিষ্ট ডিবি ও র্যাব কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, নিহত আশরাফুল ও মালয়েশিয়া প্রবাসী জারেজুল বাল্যবন্ধু। দুজনের বাড়িই রংপুরে। বছর তিনেক আগে ফেসবুকে কুমিল্লার এক প্রবাসীর স্ত্রী শামীমার সঙ্গে পরিচয় হয় জারেজুলের। দুই সন্তান নিয়ে কুমিল্লায় থাকা শামীমার সঙ্গে তার বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক গড়ে ওঠে। মাঝেমধ্যে মালয়েশিয়া থেকে দেশে এসে তিনি শামীমার সঙ্গে দেখা করতেন। এ সম্পর্কের কথা জারেজুল তার বন্ধু আশরাফুলকে জানিয়েছিলেন।
পরে আশরাফুলও শামীমার ফোন নম্বর সংগ্রহ করে যোগাযোগ করেন এবং তাদের মধ্যেও সম্পর্ক তৈরি হয়। গত ২৩ অক্টোবর জারেজুল মালয়েশিয়া থেকে এসে রাজধানীর দক্ষিণ দনিয়া এলাকায় একটি বাসা ভাড়া নেন। সেখানে শামীমাকে নিয়ে ওঠেন এবং আশরাফুলও সেখানে যান। তখন জারেজুল জানতে পারেন আশরাফুলের সঙ্গে শামীমার সম্পর্কের বিষয়টি।
এ নিয়ে দুই বন্ধুর মধ্যে তর্ক হয়। এর জেরে মঙ্গলবার (১১ নভেম্বর) রাত থেকে বুধবার (১২ নভেম্বর) সকালের মধ্যে বাসাটিতে আশরাফুলকে হত্যা করা হয়। বৃহস্পতিবার (১৩ নভেম্বর) সকাল পর্যন্ত লাশ বাসায় রাখা হয়। বাইরে থেকে খাবার এনে জারেজুল ও শামীমা খান। বৃহস্পতিবার সকালে দুজনে মিলে বাথরুমে লাশ ২৬ টুকরো করেন এবং ড্রামে ভরেন। পরে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ড্রামগুলো নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে হাইকোর্টের সামনে ফেলে যান।
এ ঘটনায় নতুন তথ্যও সামনে এসেছে। বৃহস্পতিবার সর্বশেষ আশরাফুলের স্ত্রী লাকি বেগম স্বামীর নম্বরে কল দিলে রিসিভ করেন জারেজ। তিনি লাকিকে বলেন, ‘ভাবি, আমি একজনের কাছে শুনলাম ভাই চট্টগ্রামে গেছে, সেখানে তাকে মানুষ খুন করেছে।’ নিহত আশরাফুলের শ্যালক রেজওয়ান তার বোনের বরাতে বিষয়টি জানান।
তবে পরিবারের সদস্যরা মনে করেন, এ হত্যাকাণ্ডে মূল অভিযুক্ত বাল্যবন্ধু জারেজই। গতকাল জারেজকে প্রধান আসামি করে শাহবাগ থানায় হত্যা মামলা করেছেন আশরাফুলের ছোট বোন মোছা. আনজিরা বেগম।
এজাহারে তিনি উল্লেখ করেন, তার ভাই দিনাজপুরের হিলি বন্দর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ, আলুসহ কাঁচামাল সরবরাহ করতেন। ১১ নভেম্বর রাত ৮টায় জারেজকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকায় আসেন। এরপর থেকে তার নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। পরিবারের সন্দেহ, পূর্বপরিকল্পিতভাবে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আশরাফুলকে হত্যা করে মরদেহ ২৬ টুকরো করে দুটি নীল ড্রামে ভরে গুম করতে নেয়া হয়।
বদরগঞ্জ থানার ওসি এ কে এম আতিকুর রহমান জানান, পরিবারের দেওয়া তথ্য রমনা জোনের ডিসি ও শাহবাগ থানার ওসিকে পাঠানো হয়েছে।
হত্যাকাণ্ড ঘিরে আরও জট তৈরি হয়েছে। নিহত আশরাফুলের ছোট বোন রাহেনা বেগমের সঙ্গে জারেজের সর্বশেষ ফোনালাপের পর থেকেই তিনি লাপাত্তা। জারেজ জানান, তিনি সায়েদাবাদ থেকে বাসে উঠেছেন, বাড়ি পৌঁছে সব জানাবেন। ওই ৭ মিনিট ১৩ সেকেন্ডের ফোন রেকর্ড গণমাধ্যমের হাতে রয়েছে।
শুক্রবার দুপুরে গোপালপুর বাজারের পাশে জারেজের বাড়িতে গেলে তার স্ত্রী জানান, তারা জানতেন জারেজ ব্যবসায়িক পাওনা টাকা আনতে বন্ধু আশরাফুলকে নিয়ে চট্টগ্রামে গেছেন।
নিহত আশরাফুলের শ্যালক রেজওয়ান বলেন, দুই বছর আগে মিয়ানমার থেকে পেঁয়াজ আমদানির সময় টেকনাফের এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে লেনদেনে প্রায় ৩০ লাখ টাকা বকেয়া পড়ে। টাকা চাইলে তিনি এড়িয়ে যেতেন। পরে বদরগঞ্জ থানায় মামলা হলে র্যাব ও পুলিশ ওই ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করে এবং তিনি তিন মাস জেল খাটেন।
হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়লে আশরাফুলের বাড়িতে শোকের মাতম শুরু হয়। আত্মীয়–স্বজনের কান্নায় পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। তার মা ও স্ত্রী বারবার মূর্ছা যান।
মা এছরা খাতুন বিলাপ করতে করতে বলেন, ‘মোর একটামাত্র ব্যাটাক ক্যান মারিল রে বাবা! মোর বুকের ধন ক্যান কাড়ি নিলো!’
স্ত্রী লাকি বেগম শোকে পাথর হয়ে যান। কখনো স্থির হয়ে বসে থাকেন, আবার হুট করেই মাটিতে গড়াগড়ি করে কাঁদেন।
বড় বোন রওশনারা বেগম বলেন, ‘হামার ভাই তো আর নাই! কিন্তু হামরা ওর বিচার চাই।’
খবরওয়ালা/টিএসএন