রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকায় তেজগাঁও কলেজের ছাত্র ইকরাম হোসেন মোল্লা (২২) হত্যা মামলায় দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) ঢাকার ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত-এর বিচারক মো. সাব্বির ফয়েজ বহুল আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে লাশ গুমের অপরাধে প্রত্যেককে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, ৫০ হাজার টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে আরও তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন মো. সিদ্দিক (২৩) ও মো. শান্ত মিয়া (২২)। আদালতের বেঞ্চ সহকারী মো. রিয়াজ হোসেন রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। আদালত রায়ে উল্লেখ করেন, উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ, আলামত, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এবং সাক্ষীদের জবানবন্দি বিশ্লেষণ করে আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। বিচারক পর্যবেক্ষণে বলেন, পরিকল্পিত ও নৃশংস এই হত্যাকাণ্ড সমাজে ভয়াবহ বার্তা দেয়; তাই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি অপরিহার্য।
ঘটনার বিবরণ
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৪ মে রাতে পাওনা টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলে ইকরামকে বাড়ি থেকে ডেকে নেয় তার বন্ধু শান্ত মিয়া ও সিদ্দিক। পরে খিলক্ষেত থানাধীন পাতিরা ও ডুমনি এলাকার মাঝামাঝি বসুন্ধরা বালুর চরে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে হাতুড়ি ও ভোঁতা বস্তু দিয়ে আঘাত করার পর এন্টিকাটার দিয়ে গলা কেটে হত্যা করা হয়। হত্যার পর লাশ গুমের উদ্দেশ্যে পাশের একটি ডোবায় ফেলে কচুরিপানা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়।
ঘটনার দুই দিন পর, ৬ মে পুলিশ ওই ডোবা থেকে ইকরামের মরদেহ উদ্ধার করে। ময়নাতদন্তে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে মৃত্যু নিশ্চিত হয়। তদন্তে হত্যার পেছনে আর্থিক লেনদেনজনিত বিরোধের বিষয়টি উঠে আসে।
মামলা ও বিচারপ্রক্রিয়া
ঘটনার পর নিহতের বাবা মো. কবির হোসেন মোল্লা খিলক্ষেত থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। তদন্ত শেষে ২০২৩ সালের ২৬ নভেম্বর আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি আদালত অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন। বিচার চলাকালে মোট ১৭ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দেন, যাদের মধ্যে ছিলেন তদন্ত কর্মকর্তা, ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক, উদ্ধারকারী পুলিশ সদস্য ও স্থানীয় সাক্ষীরা।
নিচে মামলার গুরুত্বপূর্ণ তারিখ ও অগ্রগতির সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হলো—
| বিষয় |
তারিখ/তথ্য |
| হত্যার তারিখ |
৪ মে ২০২৩ |
| মরদেহ উদ্ধার |
৬ মে ২০২৩ |
| অভিযোগপত্র দাখিল |
২৬ নভেম্বর ২০২৩ |
| অভিযোগ গঠন |
২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ |
| সাক্ষীর সংখ্যা |
১৭ জন |
| রায় ঘোষণা |
২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ |
আইনজীবীরা জানিয়েছেন, উচ্চ আদালতে আপিলের সুযোগ রয়েছে। তবে রায় ঘোষণার সময় আদালতকক্ষে উপস্থিত নিহতের পরিবার সন্তোষ প্রকাশ করে দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপের দাবি জানান।
আইনবিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডে মৃত্যুদণ্ডের রায় অপরাধ দমনে কঠোর বার্তা দেয়। একই সঙ্গে এ ধরনের ঘটনায় সামাজিক সচেতনতা, তরুণদের মধ্যে আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা এবং বিরোধ নিষ্পত্তিতে আইনি পথ অনুসরণের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন তারা।