খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 6শে বৈশাখ ১৪৩৩ | ১৯ই এপ্রিল ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং এর শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের অধিকার নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। সম্প্রতি তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে তিনি এই মন্তব্য করেন। প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, ইরানের জাতীয় অধিকার ও প্রযুক্তিগত অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করার কোনো আইনগত বা নৈতিক ভিত্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেই।
ইরানি স্টুডেন্ট নিউজ এজেন্সি (আইএসএনএ)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, “ট্রাম্প দাবি করছেন যে ইরান তার পারমাণবিক অধিকার ব্যবহার করতে পারবে না। কিন্তু তিনি এটি স্পষ্ট করছেন না যে, ঠিক কোন অপরাধের দায়ে ইরানের ওপর এই নিষেধাজ্ঞা বা বাধা আরোপ করা হচ্ছে?”
প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান প্রশ্ন তোলেন যে, একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম জাতির আইনগত অধিকার কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা বা এখতিয়ার ডোনাল্ড ট্রাম্প বা অন্য কোনো বিদেশি শক্তির থাকতে পারে না। তিনি মনে করেন, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ইরান তার জ্বালানি চাহিদা মেটানো এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের পূর্ণ অধিকার রাখে।
ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিরোধ কয়েক দশকের পুরনো। ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত যৌথ ব্যাপক কর্ম পরিকল্পনা (JCPOA) বা পরমাণু চুক্তির মাধ্যমে এই বিরোধ নিষ্পত্তির একটি পথ তৈরি হয়েছিল। তবে ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন মার্কিন প্রশাসন একতরফাভাবে এই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যায় এবং ইরানের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা পুনরায় আরোপ করে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়।
নিচে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বিতর্কের মূল বিষয়গুলো একটি সারণির মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
| বিষয় | বিবরণ |
| মূল চুক্তি (JCPOA) | ২০১৫ সালে ইরান ও বিশ্বের ছয়টি শক্তিধর রাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়। |
| মার্কিন অবস্থান (২০১৮) | প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একতরফাভাবে চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ান। |
| ইরানের দাবি | পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং বেসামরিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে। |
| নিষেধাজ্ঞার প্রভাব | ইরানের তেল রপ্তানি এবং ব্যাংকিং খাতের ওপর ব্যাপক অর্থনৈতিক চাপ। |
| আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ | আইএইএ (IAEA) ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো নিয়মিত পরিদর্শন করে। |
প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের এই বক্তব্য মূলত ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে জাতীয়তাবোধ জাগ্রত করা এবং আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করার একটি প্রয়াস। ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে যে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে না, বরং চিকিৎসা বিজ্ঞান, কৃষি এবং বিদ্যুৎ খাতের উন্নতির জন্য এই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।
অন্যদিকে, ওয়াশিংটন এবং তার মিত্র দেশগুলোর দাবি, ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। এই পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং কূটনৈতিক অচলাবস্থার কারণে বারবার আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে। পেজেশকিয়ানের সাম্প্রতিক এই কড়া প্রতিক্রিয়া ইঙ্গিত দেয় যে, সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে ইরান কোনো প্রকার ছাড় দিতে রাজি নয়।
পারমাণবিক ইস্যুতে দুই দেশের এই বাগযুদ্ধ বিশ্ববাজারে তেলের দাম এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলে। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ইরানের এই অবস্থান পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে আলোচনার পথকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। তবে তেহরান তার অবস্থানে অনড় থেকে বিশ্ব সম্প্রদায়কে এটিই বোঝাতে চাচ্ছে যে, তারা বিদেশি শক্তির কোনো অন্যায্য চাপ বা নির্দেশ মেনে নেবে না।
প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের এই বক্তব্যটি এমন এক সময়ে এল যখন আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA) ইরানের সাথে নতুন করে আলোচনার চেষ্টা চালাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের বিরুদ্ধে পেজেশকিয়ানের এই মন্তব্য পারমাণবিক কূটনীতিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করল।