খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩ মার্চ ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযানের প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে স্পেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় সামরিক ঘাঁটিগুলো ব্যবহার করে ইরানে হামলা চালানোর বিষয়ে মাদ্রিদ সরকার অত্যন্ত কঠোর ও অনমনীয় অবস্থান গ্রহণ করেছে। সোমবার (২ মার্চ) আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও ফ্লাইট ট্র্যাকিং ওয়েবসাইটগুলোর তথ্যে দেখা গেছে, স্পেনের আকাশসীমা ও ঘাঁটি ব্যবহার নিয়ে তৈরি হওয়া উত্তেজনার মুখে বেশ কিছু মার্কিন যুদ্ধবিমান স্পেন ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে।
ফ্লাইট ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ‘ফ্লাইটরাডার ২৪’-এর রাডার মানচিত্রে দেখা গেছে, স্পেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় রোটা (Rota) ও মোরন (Morón) সামরিক ঘাঁটি থেকে অন্তত ১৫টি মার্কিন বিমান উড্ডয়ন করেছে। স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে ম্যানুয়েল আলবারেস স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন যে, ইরানে হামলার উদ্দেশ্যে স্পেনের কোনো সামরিক স্থাপনা ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। যদিও এই ঘাঁটিগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও স্পেন যৌথভাবে পরিচালনা করে, তবে মাদ্রিদ সরকার সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে তাদের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ করে এমন কোনো আগ্রাসী অভিযানে তারা অংশীদার হবে না।
নিচে স্পেন ত্যাগ করা মার্কিন বিমান ও তাদের গন্তব্য সংক্রান্ত একটি সংক্ষিপ্ত তথ্যসারণি দেওয়া হলো:
| বিমানের ধরন | সংখ্যা (প্রায়) | বর্তমান অবস্থান/গন্তব্য | মূল ভূমিকা |
| বোয়িং কেসি-১৩৫ | ৭টি | রামস্টেইন বিমানঘাঁটি, জার্মানি | আকাশে জ্বালানি সরবরাহ (ট্যাঙ্কার) |
| অন্যান্য যুদ্ধবিমান | ৮টি | ইউরোপের বিভিন্ন ঘাঁটি | সরাসরি আক্রমণ ও নজরদারি |
| পরিচালনাকারী দেশ | যুক্তরাষ্ট্র | — | অপারেশন ‘এপিক ফিউরি’ |
স্পেনের সম্প্রচারমাধ্যম টেলেসিনকোকে (Telecinco) দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলবারেস বলেন, “জাতিসংঘের সনদ বা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের দ্বিপাক্ষিক চুক্তির বাইরে কোনো সামরিক অভিযানে স্পেনের মাটি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হবে না।” তিনি আরও যোগ করেন যে, স্পেন মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতার পক্ষে এবং যেকোনো ধরণের একতরফা সামরিক হামলার তীব্র নিন্দা জানায়। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের এই অবস্থান ওয়াশিংটন ও মাদ্রিদের দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সম্পর্কের ওপর নতুন করে চাপের সৃষ্টি করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ইরান ইস্যুতে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে ঐক্যের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। স্পেন যেখানে সরাসরি অস্বীকৃতি জানাচ্ছে, সেখানে অন্যান্য মিত্রদের অবস্থান ভিন্ন। শুরুতে যুক্তরাজ্য তাদের ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিতে দ্বিধাগ্রস্ত থাকলেও, গত রোববার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ‘সম্মিলিত আত্মরক্ষার’ (Collective Self-Defense) অজুহাতে ব্রিটিশ ঘাঁটিগুলো ব্যবহারের অনুমতি প্রদান করেন। অন্যদিকে, স্পেন থেকে বিতাড়িত মার্কিন বিমানগুলোর বড় একটি অংশ জার্মানির রামস্টেইন বিমানঘাঁটিতে আশ্রয় নিয়েছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে জার্মানি বা ইতালি এই অভিযানে পরোক্ষ সমর্থন দিচ্ছে।
স্পেনের এই সাহসী অবস্থান মূলত ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তাদের প্রভাব বৃদ্ধির একটি ইঙ্গিত। প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এর আগেও ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে পশ্চিমা দেশগুলোর একতরফা নীতির সমালোচনা করেছেন। স্পেনের এই সিদ্ধান্তের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র লজিস্টিক সহায়তা কিছুটা বিঘ্নিত হতে পারে, কারণ ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে রোটা ও মোরন ঘাঁটিগুলো কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই কূটনৈতিক টানাপোড়েন আগামীতে ন্যাটোর (NATO) সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবকে আরও প্রকট করে তুলতে পারে। স্পেন সরকার স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তারা কোনোভাবেই একটি আঞ্চলিক মহাযুদ্ধের অংশীদার হতে চায় না।