খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ১৪ জুন ২০২৫
ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধ শুরু হয়েছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, ইসরায়েল ‘যত দিন প্রয়োজন’ হামলা চালিয়ে যাবে। তাদের উদ্দেশ্য ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প ধ্বংস ও দেশটির সামরিক শক্তি দুর্বল করা। তবে এ লক্ষ্য কতটা সফল হবে, সময়ই তা নির্ধারণ করবে।
ইরান ইতোমধ্যে ইসরায়েলে ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। হাতে আরও কিছু সীমিত পাল্টা জবাবের বিকল্প রয়েছে। যদিও রক্তক্ষয় সম্ভবত অনিবার্য, তবু যুদ্ধ থামাতে ও এর পরিণতি নিয়ে এখনই ভাবা দরকার।
এ নিয়ে চারটি সম্ভাব্য দৃশ্যপট বিশ্লেষকরা তুলে ধরেছেন।
প্রথমত, ইরান বড় ধরনের সামরিক হামলা চালিয়ে দেশবাসীর প্রতিশোধের দাবি পূরণ করবে। এরপর দ্রুত যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক উদ্যোগে যুদ্ধবিরতিতে রাজি হবে। সংক্ষেপে, মুখ রক্ষার জন্য এটি হবে ‘কৌশলগত আত্মসমর্পণ’।
হিজবুল্লাহ পূর্বেও একইভাবে বাধ্য হয়েছিল।
এ ছাড়া, হিজবুল্লাহর মতো ইরানের প্রধান মিত্ররাও এখন আগের অবস্থার চেয়ে দুর্বল। এটি ইঙ্গিত দেয় যে ইরানের একসময়ের নির্ভরযোগ্য প্রতিরোধ ব্যবস্থা (ডিটারেন্ট) এখন অকার্যকর। ইরানের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের চালানো বিধ্বংসী হামলা ইরানের নেতৃত্বকে বিশৃঙ্খল করে দিতে পারে। এতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো বা দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া তাঁদের জন্য কঠিন হয়ে পড়তে পারে। তেহরান দ্রুত শীর্ষ কমান্ডারদের পরিবর্তনের ঘোষণা দিলেও চলমান সংঘাতে এই নতুন নেতৃত্বের কার্যকারিতা এখনো স্পষ্ট নয়। ইসরায়েল সম্ভবত নতুন কমান্ডার এবং তাদের স্থলাভিষিক্তদের ওপরও হামলা চালাবে। ইরান অবশ্যই যুদ্ধের মধ্যে আত্মসমর্পণ করতে চায় না, কিন্তু তারা হয়তো ক্রমাগত হামলা সহ্য না করে ভবিষ্যতের জন্য টিকে থাকার পথ বেছে নেবে।
দ্বিতীয় সম্ভাবনা হলো, ইরান গেরিলা কৌশল, প্রক্সি গোষ্ঠী ও ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে ইসরায়েলকে কিছুটা চাপে রাখবে। একইসাথে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানাবে। ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের কথাই সবচেয়ে গুরুত্ব দেবে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যদি চাপ বাড়ান, ইসরায়েল হামলা কমাতে পারে।
এই চাপ দুই দেশকে ফলপ্রসূ কূটনীতির দিকে নিয়ে যাবে কি না, তা স্পষ্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে একটি আলোচনার চুক্তির জন্য চাপ সৃষ্টি করেছিল। এই প্রস্তাবিত চুক্তিটি ২০১৫ সালের জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশনের মতোই। তবে ট্রাম্প ২০১৮ সালে এই চুক্তি থেকে সরে এসেছিলেন। ট্রাম্প নতুন করে প্রস্তাব দেওয়ার পর ইরান এই আলোচনাকে গুরুত্বসহকারে নিয়েছিল। দেশটির নেতৃত্বের আপাত সমর্থন ছিল, তবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে উত্তেজনাও ছিল। যা-ই হোক, ট্রাম্প হামলার পর ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ‘ইরানকে একটি চুক্তি করতেই হবে। এর আগে আর কিছুই থাকবে না এবং যা একসময় ইরানের সাম্রাজ্য নামে পরিচিত ছিল, তা রক্ষা করতে হবে। আর মৃত্যু নয়, আর ধ্বংস নয়, শুধু এটা করুন, খুব দেরি হওয়ার আগে।’
এই ধরনের আলোচনা তেহরানের জন্য আকর্ষণীয়—দেশটির অর্থনীতি বিপর্যস্ত এবং নিষেধাজ্ঞা কমানোর প্রতিশ্রুতি তাদের কাছে লোভনীয়। এ ছাড়া ইসরায়েলের ধ্বংসাত্মক অভিযানের পর আলোচনার টেবিলে ইরানকে কম ছাড় দিতে হবে। তবে ইসরায়েলি হামলার মুখে এটি রাজনৈতিকভাবে আরও কঠিন। ট্রাম্প যেকোনো ছাড়কে নিজের বিজয় বলে ঘোষণা করবেন এবং ইরানকে চাপের মুখে নতি স্বীকার করা হয়েছে বলে মনে হবে।
তবে এমন ইতিবাচক পরিস্থিতির বিপরীতে অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিস্থিতিও সম্ভব এবং সম্ভবত এটিই ঘটার আশঙ্কা বেশি। বিপর্যয়কর পরিস্থিতিগুলোর মধ্যে একটি হলো ইরান-ইসরায়েল সংঘাত আঞ্চলিক যুদ্ধে পরিণত হতে পারে। ইসরায়েলি হামলার আগে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্থাপনায় হামলার হুমকি দিয়েছিল। এ ধরনের হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা অনেক বেড়ে যেত। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং আকাশ প্রতিরক্ষাসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েলকে সমর্থন ইরানকে এই ধারণা দিতে পারে যে যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করছে।
তৃতীয় সম্ভাবনা সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি। সংঘাত বড় আকারে ছড়িয়ে পড়লে যুক্তরাষ্ট্রও সরাসরি জড়িয়ে যেতে পারে। ইরান যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে হামলা চালাতে পারে। আবার যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় বড় ধরনের বোমা হামলা করতে পারে। এতে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি আছে।
ইরান সম্ভবত ইরাক, লেবানন, ইয়েমেন এবং অন্যান্য স্থানে তাদের প্রক্সিদের ইসরায়েলে হামলা চালানোর জন্য যা যা করা সম্ভব, করতে বলবে। যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো কারণে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে তারাও মার্কিন স্থাপনাকে তাদের লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। এভাবে, যুক্তরাষ্ট্র ইয়েমেন, ইরাক এবং অন্যান্য স্থানে ইরানি প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে পারে।
বর্তমানে অসম্ভাব্য মনে হলেও এই সংঘাতে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আরব মিত্ররা জড়িত হতে পারে। জর্ডানের সশস্ত্র বাহিনী এরই মধ্যে তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করা ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আটকের খবর জানিয়েছে। জর্ডানের এই পদক্ষেপকে আত্মরক্ষা হিসেবে দেখানো হলেও যদি যুক্তরাষ্ট্র জড়িত হয়, তাহলে ওয়াশিংটন মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত তাদের ঘাঁটি ব্যবহার করতে পারে অথবা তাদের ওপর নির্ভর করতে পারে।
একটি চূড়ান্ত সম্ভাবনা হলো, যুদ্ধ কখনোই শেষ হবে না। অন্তত আনুষ্ঠানিক অর্থে নয়। যদিও ইসরায়েলের বিশাল আকারের হামলার ঢেউ হয়তো একসময় থামবে, কিন্তু নিম্নস্তরের সংঘাত আরও কয়েক মাস ধরে চলতে পারে। ইসরায়েল হয়তো মাঝেমধ্যে ইরানে ক্ষেপণাস্ত্র বা বিমান হামলা চালাবে, পাশাপাশি ইরানে গুপ্তহত্যা ও অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড চালাবে। ইরানও মাঝেমধ্যে ইসরায়েলের দিকে হামলা চালাবে, সঙ্গে অন্যান্য উপায়েও পাল্টা আঘাতের চেষ্টা করবে। এটি সর্বাত্মক যুদ্ধ না হলেও কোনো স্বস্তিদায়ক পরিস্থিতিও নয়।
ক্রমাগত পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যে, ইরান হয়তো পারমাণবিক অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক পরিদর্শন ছাড়াই গোপন পারমাণবিক কর্মসূচি তৈরি করতে পারে এবং ইসরায়েলি হামলাকে এর ন্যায্যতা হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। ইসরায়েল যদি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের তিনটি সংরক্ষণাগারেই আঘাত না করে, তাহলে তেহরানের জন্য এই কাজটি কঠিন হবে না।
আবার, বিভিন্ন সম্ভাবনার সমন্বয়ও সম্ভব। মার্কিন মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি একটি বৃহত্তর পারমাণবিক চুক্তির প্রথম ধাপ হতে পারে। ইরান হয়তো স্বল্প মেয়াদে ছাড় দেবে, কিন্তু বিশ্বাস করবে যে—প্রতিশোধ ঠান্ডা মাথায় নিতে হয় এবং আগামী মাসগুলোতে প্রক্সি হামলা চালাবে এবং প্রতিশোধের একটি রূপ হবে এটি। এভাবেই এটি একটি চিরস্থায়ী পাল্টাপাল্টি হামলার যুদ্ধে পরিণত হবে।
খবরওয়ালা/এন