নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: সোমবার, ২৩ জুন ২০২৫
বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথগুলোর একটি হরমুজ প্রণালী সাম্প্রতিক ইতিহাসে বারবার ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘর্ষের কৌশলগত কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের সংযোগস্থল হিসেবে হরমুজ প্রণালী কেবল একটি জলপথ নয়, বরং এটি একটি ভূরাজনৈতিক শক্তির উৎস—বিশেষ করে ইরানের জন্য।
বিশ্বজুড়ে সরবরাহকৃত অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে যায়। ফলে এটির নিরাপত্তা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বাস্তবতা ইরানকে একটি কৌশলগত সুবিধা দিয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলো বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তখন ইরান প্রায়শই হুমকি দেয় এই প্রণালী “বন্ধ করে দেওয়ার।”
ইরানের সামরিক পরিকল্পনায় হরমুজ প্রণালীকে “অসামান্য প্রতিরোধের কেন্দ্র” হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্র এবং এর মিত্ররা চায় এটি খোলা ও নিরাপদ রাখতে। এই কারণেই যুক্তরাষ্ট্র পারস্য উপসাগরে নিয়মিত নৌবাহিনী মোতায়েন করে রেখেছে, যার নেতৃত্বে রয়েছে বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন ৫ম নৌবহর।
১৯৮০-এর দশকের ইরান-ইরাক যুদ্ধে হরমুজ প্রণালীতে শুরু হয় তথাকথিত ট্যাংকার ওয়ার। উভয় দেশ একে অপরের তেল ট্যাঙ্কারে হামলা চালাতে থাকে। এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ‘অপারেশন আরনেস্ট উইল” নামে একটি সামরিক অভিযান চালিয়ে ট্যাঙ্কারগুলোকে নিরাপত্তা দিয়ে পার করে।
এরপর ২০১১-১২ সালে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বৃদ্ধি পেলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। জবাবে ইরান স্পষ্ট ভাষায় জানায়, তারা চাইলে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে জানায়—এ ধরনের চেষ্টা হলে সামরিক জবাব দেওয়া হবে।
সর্বশেষ ২০১৯ সালে, হরমুজ প্রণালী ঘিরে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। একাধিক তেলবাহী জাহাজে হামলার পর পশ্চিমা শক্তিগুলো ইরানকে দায়ী করে। এর পরপরই ইরান ব্রিটিশ ট্যাঙ্কার স্টেনা ইমপারো জব্দ করে। যুক্তরাষ্ট্র একটি ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করে এবং পাল্টা ড্রোন হামলার পরিকল্পনাও করে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, যুদ্ধাবস্থা প্রায় তৈরি হয়ে গিয়েছিল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমুজ প্রণালী সরু এবং সহজেই নিয়ন্ত্রণযোগ্য হওয়ায় ইরান চাইলে এটি সাময়িকভাবে অচল করে দিতে পারে। তাদের আইআরজিসি নেভি (ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড বাহিনী) রয়েছে দ্রুতগামী নৌকা, সমুদ্র-মাইন, উপকূলীয় ক্ষেপণাস্ত্র, সাবমেরিন এবং সামরিক ড্রোনের মতো সরঞ্জাম। এসব ব্যবহারে তারা প্রয়োজনে—
নৌমাইন বসিয়ে চলাচল বন্ধ করতে পারে, তেলবাহী জাহাজে হামলা বা জব্দ করতে পারে, সমুদ্রপথে গোপন ড্রোন হামলা চালাতে পারে, উপকূল থেকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে পারে
এই হুমকি মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশ যৌথভাবে হরমুজ প্রণালীতে নিরাপত্তা নিশ্চিতে নৌবাহিনী মোতায়েন করে। ২০১৯ সালে গঠিত হয় Coalition of Maritime Security, যার লক্ষ্য ছিল প্রণালীতে অবাধ এবং নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত করা।
প্রণালী ঘিরে প্রতিটি উত্তেজনায় আন্তর্জাতিক তেলবাজার কেঁপে ওঠে। কেবল হুমকির জোরেই কখনো কখনো তেলের দাম হু-হু করে বেড়ে যায়, যার প্রভাব পড়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে।
হরমুজ প্রণালী বর্তমানে শুধু একটি জ্বালানি পথ নয়, বরং বিশ্ব কূটনীতির এক উত্তপ্ত সূচক। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘর্ষে এটি রয়ে গেছে এক দোদুল্যমান সীমানা, যার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ভবিষ্যতেও উত্তেজনা অব্যাহত থাকবে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।
সূত্র: তথ্যগুলো গুগল থেকে প্রাপ্ত
খবরওয়ালা/এমএজেড