দেশের ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা ২০২৫ সালের শেষ সময়ে সার্বিকভাবে স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি বজায় রেখেছে। তবে ত্রৈমাসিক হিসেবে প্রবৃদ্ধির গতি কিছুটা শ্লথ হয়েছে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক চাপ, বাণিজ্য প্রবাহে ওঠানামা এবং ঋণ চাহিদার তুলনামূলক হ্রাসের ইঙ্গিত বহন করে। তা সত্ত্বেও বার্ষিক ভিত্তিতে আমানত ও বিনিয়োগ উভয় ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা গেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থায় মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪ লাখ ৮১ হাজার কোটি টাকা। একই বছরের সেপ্টেম্বর শেষে এই পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে আমানত বৃদ্ধি পায় ১১ হাজার কোটি টাকারও বেশি। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের তুলনায় এই আমানত প্রায় ৯ শতাংশেরও বেশি হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের মোট ব্যাংকিং আমানতের প্রায় এক চতুর্থাংশ এখন ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার অধীনে রয়েছে।
অন্যদিকে, ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার মোট বিনিয়োগ বা ঋণ বিতরণের পরিমাণ ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে দাঁড়ায় ৫ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকায়। সেপ্টেম্বরের তুলনায় এটি প্রায় ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বেশি। বার্ষিক ভিত্তিতে এই বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধিও প্রায় সাড়ে নয় শতাংশের কাছাকাছি। দেশের মোট ঋণ ও অগ্রিমের প্রায় ২৯ শতাংশের বেশি অংশ এই ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো আমানত ও বিনিয়োগের অনুপাত, যা ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে এই অনুপাত ছিল শূন্য দশমিক ৯৭। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে তা কমে শূন্য দশমিক ৯৬ এবং ডিসেম্বর শেষে আরও কমে শূন্য দশমিক ৯৪-এ নেমে আসে। এটি তুলনামূলকভাবে সতর্ক ঋণ প্রদান নীতির ইঙ্গিত দেয়।
ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রধান সূচক
| সূচক |
ডিসেম্বর ২০২৪ |
সেপ্টেম্বর ২০২৫ |
ডিসেম্বর ২০২৫ |
| মোট আমানত (কোটি টাকা) |
৪৪০০০০ |
৪৭০০০০ |
৪৮১০০০ |
| মোট বিনিয়োগ (কোটি টাকা) |
৪৭৯০০০ |
৫১৭০০০ এর বেশি |
৫২৫০০০ |
| আমানত ও বিনিয়োগ অনুপাত |
০.৯৭ |
০.৯৬ |
০.৯৪ |
| রপ্তানি আয় (কোটি টাকা) |
৩৮৮২২ |
৩৫৫০০ এর কাছাকাছি |
৩১৫৩১ |
| আমদানি ব্যয় (কোটি টাকা) |
৫৩৩৩৫ |
৪৯০০০ এর বেশি |
৪৭০০৭ |
| প্রবাসী আয় (কোটি টাকা) |
৩১৯১৪ |
২৬০০০ এর বেশি |
২৭৫৩৮ |
| শাখা সংখ্যা |
— |
— |
১৭৪৩ |
| কর্মসংস্থান |
৫২৫৬৫ |
৫০৯৪৪ |
৪৭৪৬০ |
বাণিজ্য খাতে আলোচ্য সময়ে মিশ্র চিত্র দেখা গেছে। রপ্তানি আয় আগের প্রান্তিকের তুলনায় প্রায় সাড়ে এগারো শতাংশ কমেছে। একই সময়ে আমদানি ব্যয়ও চার শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে। এর বিপরীতে প্রবাসী আয় পাঁচ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সামগ্রিক তারল্য পরিস্থিতিকে কিছুটা সহায়তা করেছে।
অবকাঠামোগত দিক থেকে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার বিস্তার অব্যাহত রয়েছে। শাখার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ১ হাজার ৭৪৩-এ পৌঁছেছে এবং সেবা প্রদানের জন্য আলাদা কার্যক্রম কেন্দ্রের সংখ্যাও বেড়েছে। তবে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে হ্রাস দেখা গেছে, যেখানে এক বছরের ব্যবধানে কর্মীর সংখ্যা কমে এসেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই খাতের টেকসই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে বাণিজ্য অর্থায়ন আরও শক্তিশালী করা, বিনিয়োগ খাত বৈচিত্র্যময় করা এবং তহবিল ব্যবহারের দক্ষতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী খাতে সহায়তা বাড়ানো গেলে আয় স্থিতিশীল থাকবে এবং ঝুঁকি কমবে।
একজন অর্থনীতিবিদ মনে করেন, আমানত ও বিনিয়োগে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি খাতটির স্থিতিশীল ভিত্তির প্রতিফলন হলেও ত্রৈমাসিক প্রবৃদ্ধির ধীরগতি ব্যাংকগুলোর সতর্ক অবস্থান ও বাজারে ঋণ চাহিদার দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। আগামী সময়ে এই গতি ধরে রাখতে নীতি সহায়তা ও কার্যকর পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।