খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২ মে ২০২৬
দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর অববাহিকা ও সংলগ্ন জেলাগুলোতে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। নদ-নদীর পানির সমতল ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র এই সতর্কবার্তা জারি করেছে। ভারতের উজানে এবং দেশের অভ্যন্তরে সাম্প্রতিক ভারী বৃষ্টিপাত এই পরিস্থিতির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
পাউবো’র বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্যানুযায়ী, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নদী বর্তমানে প্রাক-মৌসুমি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পাউবো’র সহকারী প্রকৌশলী মোস্তফা কামাল জিহান এই পরিস্থিতির বিশদ বিবরণ প্রদান করেছেন। বর্তমান পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে:
সুনামগঞ্জ: জেলার নলজুর নদী জগন্নাথপুর পয়েন্টে প্রাক-মৌসুমি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে।
নেত্রকোনা: জেলার ভুগাই-কংস নদী জারিয়াজাঞ্জাইল পয়েন্টে এবং সোমেশ্বরী নদী কমলাকান্দা পয়েন্টে বিপৎসীমার ওপরে অবস্থান করছে। এ ছাড়া মগরা নদী নেত্রকোনা শহর ও আটপাড়া পয়েন্টে বিপৎসীমা ছাড়িয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
হবিগঞ্জ: জেলার সুতাং নদী সুতাং-রেলওয়ে ব্রিজ পয়েন্টে প্রাক-মৌসুমি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
সিলেট: সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানির সমতল গত ২৪ ঘণ্টায় স্থিতিশীল থাকলেও তা অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টার আবহাওয়া বিশ্লেষণে দেখা গেছে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উজানে (ভারতের মেঘালয় ও আসামের পাহাড়ি এলাকা) মাঝারি থেকে মাঝারি-ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। একই সময়ে দেশের অভ্যন্তরে হাওর অববাহিকায় ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ও বৈশ্বিক আবহাওয়া সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ৩ দিন এই অঞ্চলে মাঝারি থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। এর ফলে সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার সুরমা-কুশিয়ারা নদীর পানির সমতল আগামী ৭২ ঘণ্টা বা ৩ দিন পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
আগামী কয়েক দিনের সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড সুনির্দিষ্ট কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে:
সিলেট ও সুনামগঞ্জ: বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় তৃতীয় দিনের মাথায় কুশিয়ারা নদীর বেশ কিছু পয়েন্টে পানি প্রাক-মৌসুমি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। এর ফলে সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার হাওর সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলগুলোতে আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ: নেত্রকোনা জেলার ধনু ও বাউলাই নদীর পানির সমতল আগামী ৩ দিন বৃদ্ধি পেতে পারে। বিশেষ করে বাউলাই নদী খালিয়াজুড়ি পয়েন্টে আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বিপৎসীমা অতিক্রম করার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ জেলার বাউলাই অববাহিকার নিম্নাঞ্চলগুলো প্লাবিত হতে পারে। তবে ভুগাই-কংস ও সোমেশ্বরী নদীর পানির সমতল আগামী ৩ দিন স্থিতিশীল থাকলেও বিদ্যমান বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকতে পারে।
মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ: হবিগঞ্জ জেলার খোয়াই ও সুতাং এবং মৌলভীবাজার জেলার মনু ও জুড়ি নদীর পানির সমতল আগামী ৩ দিন বৃদ্ধি পাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে খোয়াই ও জুড়ি নদীর পানি আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। মনু নদীর পানি সতর্কসীমার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। এর ফলে মৌলভীবাজারের নিম্নাঞ্চলে নতুন করে বন্যা দেখা দিতে পারে এবং হবিগঞ্জের চলমান বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।
প্রাক-মৌসুমি এই বন্যা পরিস্থিতির ফলে হাওর অঞ্চলের বোরো ফসল এবং স্থানীয় জনপদের জানমালের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচিত হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড নিয়মিতভাবে নদ-নদীর সমতল পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তথ্য সরবরাহ করছে। নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পাশাপাশি নদীর তীরবর্তী প্রতিরক্ষা বাঁধগুলোর অবস্থা পর্যবেক্ষণে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। উজানে বৃষ্টিপাত না কমলে এবং দেশের অভ্যন্তরে অতিভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকলে এই প্রাক-মৌসুমি সংকট দীর্ঘায়িত হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন।