খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২ মে ২০২৬
নীলফামারী জেলায় অবস্থিত উত্তরা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (উত্তরা ইপিজেড) অন্যতম বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান ম্যাজেন (বিডি) লিমিটেড অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। চশমা ও অপটিক্যাল ফ্রেম প্রস্তুতকারী এই চীনা মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানটি গত বুধবার (২৯ এপ্রিল) বিকেলে এক লিখিত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে কারখানাটি ‘লে-অফ’ বা সাময়িক বন্ধের সিদ্ধান্ত শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছে। বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও কাঁচামাল সংকটের কারণে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে।
কারখানা কর্তৃপক্ষ প্রদত্ত বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বর্তমানে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তীব্র বৈশ্বিক সংকট বিরাজ করছে। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতাদের পক্ষ থেকে নতুন ক্রয় আদেশ বা অর্ডারের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। কাঁচামাল সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ায় কারখানার নিয়মিত উৎপাদন প্রক্রিয়া সচল রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
কারখানার পরিচালক (অপারেশন) এরেন লি স্বাক্ষরিত ওই নোটিশে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বায়ারদের চাহিদা কমে যাওয়া এবং প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাবে কারখানার উৎপাদন ক্ষমতা ব্যাহত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে কারখানাটি পরিচালনা করা আর্থিকভাবে চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়ায় কর্তৃপক্ষ ‘বাংলাদেশ ইপিজেড শ্রম আইন ২০১৯’-এর সংশ্লিষ্ট ধারা মোতাবেক সাময়িকভাবে কার্যক্রম স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বাংলাদেশ ইপিজেড শ্রম আইন ২০১৯-এর ১৫ ধারা অনুসরণ করে বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কারখানাটির সকল কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। নোটিশে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, ‘লে-অফ’ চলাকালীন কোনো শ্রমিক বা কর্মচারীকে কারখানায় উপস্থিত হওয়ার প্রয়োজন নেই।
শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধার বিষয়ে বিজ্ঞপ্তিতে আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, আইন অনুযায়ী নির্ধারিত লে-অফকালীন সকল পাওনা বেতন ও ভাতাদি শ্রমিকরা যথাসময়ে প্রাপ্ত হবেন। এছাড়া আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে শ্রমিক ও কর্মকর্তাদের উৎসব ভাতা বা বোনাস প্রদানের বিষয়েও বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আগামী ৭ মে থেকে ১৪ মে-এর মধ্যে সকল কর্মরতদের বোনাস সরাসরি ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে তাদের নিজ নিজ অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দেওয়া হবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
উত্তরা ইপিজেডের নির্বাহী পরিচালক (ইডি) মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার বৃহস্পতিবার দুপুরে গণমাধ্যমের কাছে ম্যাজেন বিডি লিমিটেড বন্ধের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, কাঁচামালের দুষ্প্রাপ্যতা এবং বিশ্ববাজারে ক্রয় আদেশ কমে যাওয়ার কারণেই মূলত কারখানা কর্তৃপক্ষ এই কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে।
তবে তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, এই বন্ধের সিদ্ধান্তটি স্থায়ী নয়। বৈশ্বিক পরিস্থিতি অনুকূলে এলে, প্রয়োজনীয় কাঁচামালের সরবরাহ স্বাভাবিক হলে এবং পর্যাপ্ত নতুন অর্ডার পাওয়া গেলে কারখানাটি পুনরায় পুরোদমে চালু করা হবে। ইপিজেড কর্তৃপক্ষ নিয়মিতভাবে এই পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে যাতে দ্রুততম সময়ে উৎপাদন প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু করা যায়।
ম্যাজেন (বিডি) লিমিটেড উত্তরা ইপিজেডের একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং বড় আকারের কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে এই কারখানায় দেশি-বিদেশি মিলিয়ে মোট ৪ হাজার ৩৬১ জন শ্রমিক ও কর্মকর্তা সরাসরি কর্মরত রয়েছেন। উৎপাদন ও প্রশাসনিক কার্যাবলীর সুবিধার্থে এখানে ৯৬ জন চীনা নাগরিক বিশেষজ্ঞ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োজিত আছেন।
বিপুল সংখ্যক শ্রমিকের এই কর্মসংস্থলটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে লে-অফ চলাকালীন শ্রমিকদের বেতন-ভাতা প্রদানের বিষয়টি নিশ্চিত করায় শ্রমিকদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি পরিলক্ষিত হচ্ছে। নীলফামারী অঞ্চলের মানুষের জন্য এই কারখানাটি একটি প্রধান আয়ের উৎস হিসেবে পরিচিত, যার পুনরায় চালু হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন কয়েক হাজার পরিবার।
উত্তরা ইপিজেড সূত্র জানায়, রপ্তানিমুখী এই প্রতিষ্ঠানটি বিশ্ববাজারে উন্নত মানের অপটিক্যাল ফ্রেম ও চশমা সরবরাহের মাধ্যমে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছিল। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থার অস্থিরতাই এই পরিস্থিতির জন্য প্রধানত দায়ী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। সংশ্লিষ্ট সকলে আশা করছেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির উন্নতির মাধ্যমে অচিরেই ৪ হাজারের অধিক শ্রমিক তাদের কর্মস্থলে ফিরতে পারবেন।