খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২ আগস্ট ২০২৫
‘অনেক আসামি দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। কেউ কেউ দেশে থাকলেও এখনো আইনের আওতায় আসেনি। বিচার যদি না হয়, তাহলে আমাদের হাজারো সন্তানের রক্ত ও আত্মত্যাগ বৃথা যাবে। আমরা রাজপ্রাসাদ চাই না—আমাদের একমাত্র চাওয়া, ছেলের হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার।’
এভাবেই বুকভরা হাহাকার নিয়ে নিজের মনের কথা বলছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শহীদ হওয়া ফেনীর তরুণ ইশতিয়াক আহমেদ শ্রাবণের বাবা নেছার আহম্মদ।
গত বছরের জুলাই-আগস্টে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে গুলিতে নিহত হন বহু তরুণ। তাঁদেরই একজন শ্রাবণ। ২০২৩ সালের ৪ আগস্ট ফেনীর মহিপাল এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হামলার শিকার হয়ে নিহত হন তিনি।
শ্রাবণের পরিবার বলছে, তিনি ফেনী সরকারি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ২০০৪ সালের ১২ ডিসেম্বর জন্ম নেওয়া এই তরুণ ছিলেন একজন সংগঠক ও ক্রিকেটার। ফেনী শহরের বারাহীপুরে বাবা-মায়ের সঙ্গে বসবাস করতেন। তিন ভাইবোনের মধ্যে শ্রাবণই ছিলেন পরিবারের একমাত্র ছেলে।
শ্রাবণের মা ফাতেমা আক্তার শিউলি বললেন, ‘৪ আগস্টের পর থেকে আমাদের গোছানো জীবনটাই এলোমেলো হয়ে গেছে। মেয়েটি সারাক্ষণ চুপচাপ বসে থাকে, কান্না করে। শ্রাবণ ছিল ওর ভাই, বন্ধু—সবকিছু। আমাদের জীবনে এখন আর কোনো আনন্দ নেই। আমাদের সুখ-আহ্লাদ সব শ্রাবণের সঙ্গেই চলে গেছে।’
ছেলের অনুপস্থিতি যন্ত্রণা হয়ে গেঁথে আছে বাবার হৃদয়ে। নেছার আহম্মদ বলেন, ‘আখিরাতে ছেলের সঙ্গে দেখা হলে সেদিনই আনন্দ হবে। এখন শুধু বুকে পাথর বয়ে বেড়াই।’
তবে সবচেয়ে বড় হতাশা এসেছে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের প্রতি। তাদের নিয়েই শ্রাবণের বাবা বলেন, ‘উনারা এখন রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত। এখন দলও গড়েছেন। শহীদ পরিবারগুলো কিভাবে চলছে, সেটা দেখার সময় কারও নেই। বাধ্য হয়েই এখনও আমাদের রাস্তায় নামতে হয়।’
মামলা, তদন্ত ও প্রশাসনের ভাষ্য
ফেনীতে আন্দোলন চলাকালে প্রাণ হারান অন্তত ১০ জন। আহত হয় কয়েক শত। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত শহীদ পরিবারের মধ্যে ১০ জনকে ১০ লাখ টাকা করে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’ ক্যাটাগরিতে ভাগ করে সর্বমোট প্রায় ৫ কোটি ৫৪ লাখ টাকার সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ফেনীতে তুলনামূলকভাবে বেশি হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হয়েছে।’
তবে পরিবারের দাবি, এ সহায়তা আর্থিক ক্ষতিপূরণ হতে পারে, কিন্তু ন্যায়ের প্রতিফলন নয়।
ফেনীর পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমান জানান, আন্দোলনের সময় ২২টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৭টি হত্যা ও ১৫টি হত্যাচেষ্টার মামলা। এসব মামলায় এজাহারনামীয় আসামি ২ হাজার ১৯৯ জন এবং অজ্ঞাত ৪ হাজার। পুলিশ ইতোমধ্যে এক হাজারেরও বেশি আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে। ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন ১১ জন। একটি মামলায় চার্জশিট দাখিল হয়েছে, বাকিগুলোর তদন্ত চলছে।
‘বিচার না হলে বিচার থাকবে না’—মায়ের আহ্বান
শ্রাবণের মা বলেন, ‘এজাহারনামীয় আসামিরা এখনো বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বড় বড় যারা এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত, তারা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছে। আমি বিচার চাই—মানুষের কাছে না হোক, আল্লাহর কাছে বিচার দিয়েছি। আমার ছেলে নামাজ-রোজা সব ঠিকমতো করতো। ওর সঙ্গে আবার দেখা হলে তখনই আমার শান্তি আসবে।’
প্রসঙ্গত, গত বছরের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে সারা দেশে শতাধিক তরুণ প্রাণ হারান বলে আন্দোলনকারী ছাত্র ও স্বজনদের দাবি। এই ঘটনার অনেক মামলা তদন্তাধীন রয়েছে, তবে অভিযুক্ত অনেকেই এখনো আইনের আওতায় আসেননি—এমনটাই অভিযোগ ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর।
খবরওয়ালা/এসআই