খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 9শে ফাল্গুন ১৪৩২ | ২১ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামষ্টিক চেতনার ইতিহাসে একুশে ফেব্রুয়ারি কেবল একটি তারিখ নয়; এটি প্রতিবাদ, আত্মত্যাগ ও পুনর্জাগরণের এক অমোঘ প্রতীক। ভাষা আন্দোলনের রক্তাক্ত অভিজ্ঞতা থেকে যে ঐতিহাসিক স্রোতের সূচনা, তা পরবর্তী সাত দশকে বারবার নতুন রূপে ফিরে এসেছে। সাহিত্য, রাজনীতি, দেয়ালচিত্র, শপথ, স্লোগান—সবকিছুর মধ্য দিয়ে একুশ হয়ে উঠেছে সংগ্রামের অনিবার্য ভাষা।
ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে রচিত আরেক ফাল্গুন উপন্যাসে আমরা দেখি ১৯৫৫ সালের একুশ উদ্যাপনকে ঘিরে প্রতিবাদ ও দমন-পীড়নের এক জীবন্ত চিত্র। উপন্যাসের শেষ দৃশ্যে জেলখানায় আন্দোলনকারীদের ঢোকানো হচ্ছে; ডেপুটি জেলার ক্লান্ত কণ্ঠে প্রশ্ন করেন, এত ছেলেকে জায়গা দেবেন কোথায়? জবাবে এক তরুণের উচ্চারণ—“আসছে ফাল্গুনে আমরা কিন্তু দ্বিগুণ হব”—বাংলাদেশের আন্দোলন-ইতিহাসে এক চিরন্তন প্রতিজ্ঞার প্রতিধ্বনি হয়ে আছে। এই উচ্চারণ কেবল সাহিত্যিক সংলাপ নয়; এটি দমন-পীড়নের বিপরীতে জনতার পুনরুত্থানের দর্শন।
জাতীয় আত্মপরিচয় কোনো অলৌকিকভাবে অবতীর্ণ সত্তা নয়; এটি নির্মিত হয় সংগ্রাম, স্মৃতি ও ত্যাগের ধারাবাহিকতায়। বাংলাদেশের সামষ্টিক স্মৃতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ছাত্রদের আত্মাহুতি আমাদের জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে। পরবর্তী সময়ে ইতিহাসচর্চায় বায়ান্নকে সূচনাবিন্দু হিসেবে ধরা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, একুশের প্রভাব ও গভীরতা নিয়ে মতভেদ নেই।
১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের আগে আবুল মনসুর আহমদ যখন ঐতিহাসিক একুশ দফা রচনা করেন, তখন সংখ্যাটির প্রতীকী গুরুত্বও বিবেচনায় আসে। শহীদ মিনার নির্মাণ, সরকারি ছুটি ঘোষণা, বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা—এসব দাবির আবহে ‘২১’ সংখ্যাটি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যুক্ত হয়। পরবর্তীকালে এই একুশ দফা পূর্ববাংলার ছাত্র-জনতার সংগ্রামের বাণীতে পরিণত হয়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিভিন্ন পর্যায়ে একুশের পুনরাবির্ভাব লক্ষ করা যায়। নিচের সারণিতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় তুলে ধরা হলো—
| সাল | প্রেক্ষাপট | একুশের ভূমিকা |
|---|---|---|
| ১৯৫২ | ভাষা আন্দোলন | রাষ্ট্রভাষার দাবিতে আত্মাহুতি |
| ১৯৫৪ | যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন | একুশ দফা কর্মসূচির প্রতীকী অনুপ্রেরণা |
| ১৯৬৯ | গণঅভ্যুত্থান | শহীদ মিনারকেন্দ্রিক দেয়ালচিত্র ও স্লোগান |
| ১৯৭১ | মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কাল | শহীদদের নামে শপথ ও স্বাধিকার ঘোষণা |
| ১৯৮৯ | স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন | গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার |
| ২০২৪ | গণ-অভ্যুত্থান | “আসছে ফাল্গুনে আমরা দ্বিগুণ হব” স্লোগানের পুনরুত্থান |
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ শহীদ মিনারের দেয়ালে প্রতিফলিত হয়। দেয়ালচিত্রে আঁকা হয় কাঁটাতারে বন্দী রবীন্দ্রনাথ, বাংলা অক্ষর ও গণতন্ত্রের প্রতীকী চিত্র। স্লোগানে উচ্চারিত হয় সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ। শহীদ মিনার তখন কেবল স্মৃতিস্তম্ভ নয়; এটি হয়ে ওঠে প্রতিরোধের উন্মুক্ত মঞ্চ।
১৯৭১ সালের একুশ ছিল আরও তাৎপর্যপূর্ণ। স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে শপথ নেওয়া হয় শহীদদের নামে। জনসমুদ্রে উচ্চারিত প্রতিজ্ঞা—রক্ত দিয়ে হলেও স্বাধিকার আদায় করা হবে—একুশের চেতনাকে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে একাত্ম করে। স্বাধীনতার পরও জাতীয় নির্মাণে একুশের স্মৃতি প্রেরণা জুগিয়েছে।
স্বাধীন বাংলাদেশে একুশ আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় পালনের বাইরে গিয়ে প্রতিবার নতুন রাজনৈতিক তাৎপর্য লাভ করেছে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে একুশকে সামনে রেখে গণতন্ত্রের অঙ্গীকার উচ্চারিত হয়েছে। সাম্প্রতিক গণ-আন্দোলনেও দেয়ালে ভেসে উঠেছে—“বায়ান্ন দেখিনি, চব্বিশ দেখেছি।” এতে স্পষ্ট, একুশের ভাষা সময়ের সঙ্গে বদলায়, কিন্তু তার অন্তর্গত দ্রোহ অমলিন থাকে।
একুশের প্রতীকী শক্তি তিনটি স্তরে কাজ করে—স্মৃতি, সংগঠন ও শপথ। প্রথমত, এটি আত্মত্যাগের স্মরণ করায়; দ্বিতীয়ত, জনতাকে সংগঠিত করে; তৃতীয়ত, ভবিষ্যৎ সংগ্রামের অঙ্গীকার জাগায়। রাষ্ট্র যখন নাগরিক অধিকার সংকুচিত করতে চায়, তখন একুশের স্মৃতি প্রতিবাদের হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
আজ বাংলাদেশ আবারও এক নতুন রাজনৈতিক যাত্রার সন্ধিক্ষণে। দীর্ঘ স্বৈরতান্ত্রিক অধ্যায় পেরিয়ে গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের প্রত্যাশা জেগেছে। এই প্রেক্ষাপটে একুশ কেবল অতীতের স্মারক নয়; এটি ভবিষ্যতের দিশারি। রাষ্ট্র যদি নাগরিকের কণ্ঠ রুদ্ধ করতে চায়, একুশের স্মৃতি আবারও উচ্চারিত হবে—“আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি?”
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, দমন যত বাড়ে, প্রতিরোধও তত প্রবল হয়। সেই প্রতিরোধের চিরন্তন প্রতীক একুশ—যা মজলুমের মুখে ভাষা তুলে দেয়, শোষণের বিরুদ্ধে সাহস জোগায়, আর ফাল্গুন এলে মনে করিয়ে দেয়: সংগ্রাম থেমে থাকে না, বরং দ্বিগুণ শক্তিতে ফিরে আসে।