খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ৮ জুন ২০২৬
এশিয়া-প্যাসিফিক (এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয়) অঞ্চলের বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বিনিয়োগের পরিধি বাড়াতে বেসরকারি বাজার (প্রাইভেট মার্কেট) এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার বৃদ্ধির ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছে। তবে আধুনিক বিনিয়োগ ব্যবস্থার সাথে তাল মেলাতে প্রতিষ্ঠানগুলোর পুরোনো ও অপ্রচলিত প্রযুক্তিগত অবকাঠামো (Legacy Systems) একটি বড় প্রতিবন্ধক হিসেবে দেখা দিয়েছে। জটিল বিনিয়োগ পোর্টফোলিও দক্ষতার সাথে পরিচালনা করার ক্ষেত্রে এই অঞ্চলের অধিকাংশ বীমা প্রতিষ্ঠানের বর্তমান ব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।
ক্লিয়ারওয়াটার অ্যানালিটিক্স হোল্ডিংস ইনকর্পোরেট (Clearwater Analytics Holdings, Inc.) এবং এ.এম. বেস্ট কোম্পানি ইনকর্পোরেট (A.M. Best Company, Inc.)-এর সাম্প্রতিক পৃথক দুটি গবেষণা প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনগুলোর তথ্যানুযায়ী, প্রযুক্তির আধুনিকায়ন না করে জটিল বিনিয়োগ খাতে প্রবেশ করার কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন ধরণের প্রাতিষ্ঠানিক ও পরিচালনগত ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে।
ক্লিয়ারওয়াটার অ্যানালিটিক্স হোল্ডিংস-এর একটি জরিপে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ১৫০ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা অংশ নেন। জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, এই অঞ্চলের বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৩.৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের এই মোট সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ (প্রায় ৩৩.৩%) বেসরকারি ঋণ (প্রাইভেট ডেট), বেসরকারি ইক্যুইটি (প্রাইভেট ইক্যুইটি), অবকাঠামো এবং অন্যান্য বিকল্প বিনিয়োগের খাতে বরাদ্দ করার পরিকল্পনা করছে। বর্তমানে এই খাতগুলোতে তাদের বিনিয়োগের পরিমাণ মোট সম্পদের ২০ শতাংশ।
বিনিয়োগের এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা থাকা সত্ত্বেও, জরিপে অংশ নেওয়া ৯৩ শতাংশ কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন যে তাদের বর্তমান পুরোনো প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধিকে মারাত্মকভাবে সীমিত করছে। জটিল সম্পদ বা বিনিয়োগের পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে মাত্র ২৩ শতাংশ কর্মকর্তা তাদের বর্তমান সিস্টেমের ওপর আস্থা প্রকাশ করেছেন। এছাড়া, মাত্র ৪২ শতাংশ বীমা প্রতিষ্ঠান তাদের ডেটা ইন্টিগ্রেশন বা তথ্য সমন্বয় ব্যবস্থাকে ‘চমৎকার’ বা মানসম্মত বলে উল্লেখ করেছে।
ক্লিয়ারওয়াটার অ্যানালিটিক্সের চিফ স্ট্র্যাটেজি অফিসার এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রেসিডেন্ট শেন অ্যাকরয়েড (Shane Akeroyd) এই বিষয়ে জানান, বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে হলে অবকাঠামোগত উন্নয়ন অপরিহার্য। তিনি উল্লেখ করেন যে, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ইতিমধ্যেই তাদের অবকাঠামো ও সক্ষমতার সামঞ্জস্য নিয়ে পর্যালোচনা শুরু করেছে।
বীমা খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর প্রভাব নিয়ে এ.এম. বেস্ট কোম্পানি ২০২৫ সালের নভেম্বরে একটি পৃথক জরিপ পরিচালনা করে, যা পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত হয়। এই জরিপের তথ্যমতে, প্রায় ৬০ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন যে আগামী এক থেকে তিন বছরের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তাদের সামগ্রিক ব্যবসায়িক মডেল পুনর্গঠন করবে। এই সম্ভাবনার কারণে ৬৬ শতাংশ প্রতিষ্ঠান আগামী ১২ থেকে ২৪ মাসের মধ্যে এআই খাতে তাদের ব্যয় বা বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে।
তবে প্রযুক্তিগত প্রস্তুতির অভাব এখানেও একটি বড় বাধা। জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ২০ শতাংশ বীমা প্রতিষ্ঠান বর্তমানে এআই ব্যবহারের উন্নত বা অগ্রসর পর্যায়ে রয়েছে। এ.এম. বেস্ট-এর ইন্ডাস্ট্রি রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিটিক্স বিভাগের সিনিয়র ডিরেক্টর শ্রীধর মানিয়েম (Sridhar Manyem) জানিয়েছেন, ডেটার মান দুর্বল হলে, তথ্য বিভিন্ন পুরোনো সিস্টেমে বিক্ষিপ্তভাবে থাকলে কিংবা সঠিক পরিচালনার অভাব হলে এআই ব্যবস্থা নির্ভরযোগ্য ফলাফল দিতে ব্যর্থ হয়। যেসকল বীমা প্রতিষ্ঠানের ডেটা গভর্ন্যান্স (তথ্য শাসন) শক্তিশালী এবং আধুনিক ব্যবস্থা রয়েছে, তারা সহজেই এআই প্রযুক্তিকে তাদের কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে।
বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর এআই প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করার পেছনে প্রধানত তিনটি মূল লক্ষ্য কাজ করছে। এগুলো হলো:
উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি: ৬৮ শতাংশ উত্তরদাতার মতে, কর্মীদের কর্মক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোই তাদের প্রধান লক্ষ্য।
পরিচালন ব্যয় হ্রাস: ৪৭ শতাংশ প্রতিষ্ঠান পরিচালন খরচ কমিয়ে আনার উদ্দেশ্যে এআই ব্যবহারের পক্ষে মত দিয়েছে।
ঝুঁকি মূল্যায়ন ও মূল্য নির্ধারণ: ৩৭ শতাংশ প্রতিষ্ঠান উন্নত আন্ডাররাইটিং (বীমা ঝুঁকি মূল্যায়ন) এবং সঠিক প্রিমিয়াম মূল্য নির্ধারণের জন্য এআই ব্যবহার করতে চায়।
তবে এই লক্ষ্যগুলো অর্জনের পথে প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ডেটা বা তথ্যের সঠিক প্রস্তুতি, সাইবার নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষা এবং পুরোনো সিস্টেমের সাথে নতুন প্রযুক্তির সমন্বয় সাধনের জটিলতা। তথ্য ও প্রযুক্তিগত এই দুর্বলতার সমাধান না করে দীর্ঘমেয়াদী প্রবৃদ্ধি অর্জন করা বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।