খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ই জুন ২০২৬, ৪:১৯ পিএম
কুমিল্লা মহানগরীতে ভারী বর্ষণের ফলে সৃষ্ট জলাবদ্ধতার মধ্যে মায়ের হাত থেকে ছিটকে খোলা ড্রেনে পড়ে স্মৃতি আক্তার (৮) নামের এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। রবিবার রাত ৯টার দিকে নগরীর ছোটরা পশ্চিমপাড়া ঈদগাহ এলাকায় এই বেদনাদায়ক দুর্ঘটনাটি ঘটে। নিহত শিশু স্মৃতি আক্তার কুমিল্লা নগরীর কালিয়াজুড়ি বদরপুর এলাকার বাসিন্দা বিল্লাল হোসেনের মেয়ে। এই ঘটনার পর থেকে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও শোকের আবহ বিরাজ করছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ থেকে জানা গেছে, কুমিল্লা নগরীর ছোটরা এলাকার মফিজাবাদ কলোনিতে শিশু স্মৃতির নানাবাড়ি অবস্থিত। সেখানে তার মামার বিয়ের অনুষ্ঠান চলছিল। বিয়ের আনন্দঘন অনুষ্ঠান শেষে মা আঞ্জুয়ারা বেগমের সঙ্গে নিজ বাসায় ফিরছিল শিশু স্মৃতি আক্তার।
তবে ঘটনার দিন দীর্ঘসময় ধরে চলা ভারী বৃষ্টির কারণে নগরীর বিভিন্ন সড়কের মতো ছোটরা এলাকার রাস্তাঘাটও পানিতে তলিয়ে যায় এবং তীব্র জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। জলাবদ্ধতার কারণে সড়কে কোনো রিকশা বা যানবাহন না পেয়ে মা ও মেয়ে একপর্যায়ে হেঁটেই বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হতে বাধ্য হন। তারা সড়কের পাশ ঘেঁষে থাকা ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় হঠাৎ অসাবধানতাবশত স্মৃতি তার মায়ের হাত থেকে ছিটকে যায়। ঠিক তখনই জলাবদ্ধ সড়কের নিচে থাকা ড্রেনের একটি ভাঙা স্ল্যাবের ফাঁক দিয়ে সে সরাসরি নর্দমার ভেতরে পড়ে যায় এবং পানির তীব্র স্রোতে তলিয়ে যায়।
শিশু স্মৃতি ড্রেনে পড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার মায়ের চিৎকারে আশপাশের লোকজন এবং পথচারীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। তারা তাৎক্ষণিকভাবে শিশুটিকে উদ্ধারের জন্য তীব্র চেষ্টা শুরু করেন। ময়লা পানি এবং অন্ধকারের মধ্যে প্রায় ১৫ মিনিট ধরে খোঁজাখুঁজির পর, দুর্ঘটনাস্থল থেকে কিছুটা দূরে ড্রেনের ভেতরে আটকে থাকা অবস্থায় শিশুটিকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। তবে পানি থেকে ওপরে তোলার পর দেখা যায় শিশুটি আর বেঁচে নেই। উদ্ধারের সময় তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। বিয়ের আনন্দ নিমেষেই এক পরিবারে বিষাদে পরিণত হয়।
স্থানিয় এলাকাবাসীর অভিযোগ, ওই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে নালা সংস্কার ও পরিষ্কারের সরকারি কাজ চলছিল। কিন্তু কাজ চলাকালীন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণে বেশ কয়েকটি স্থানে নালার ঢাকনা বা স্ল্যাব সম্পূর্ণ খোলা রাখা হয়েছিল। এছাড়া অনেকগুলো স্ল্যাব দীর্ঘদিন ধরে ভাঙা অবস্থায় পড়ে ছিল।
টানা ভারী বর্ষণের কারণে সড়কে ব্যাপক পানি জমে যাওয়ায় ওই খোলা ড্রেন ও ভাঙা অংশগুলো পানির নিচে সম্পূর্ণ ঢেকে যায়। ফলে ওপর থেকে দেখে পথচারীদের পক্ষে নিচে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপজ্জনক গর্তের বিষয়টি বোঝার কোনো উপায় ছিল না। স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন সড়কের পাশের ড্রেনগুলো দীর্ঘদিন ধরে এমন অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জন্য কার্যত মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। তারা দ্রুত এই ঝুঁকিপূর্ণ ড্রেনগুলো সংস্কার ও ঢাকনা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার খবর পেয়ে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের (কুসিক) প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা টিপু দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, “এই ঘটনাটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। আমি এর জন্য গভীর দুঃখ প্রকাশ করছি। নগরীর যতগুলো অরক্ষিত বা খোলা স্ল্যাব রয়েছে, সেগুলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঢেকে দেওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এছাড়া আমি ব্যক্তিগতভাবে শিশুটির পরিবারের সঙ্গে দেখা করে আমাদের সাধ্য অনুযায়ী তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব।”
কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. তৌহিদুল আনোয়ার ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশের একটি বিশেষ দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। সুরতহাল ও প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে এটি একটি দুর্ঘটনা বলেই প্রতীয়মান হয়েছে। তবে শিশুটির পরিবারের পক্ষ থেকে যদি কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ বা মামলা দায়ের করা হয়, তবে পুলিশ বিষয়টি আইনগতভাবে তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
মন্তব্য