খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫
বিজ্ঞানীরা মহাকাশযান এবং নভোচারীদের দ্বারা স্থাপিত আয়না থেকে লেজার রশ্মি নিক্ষেপ করে চাঁদের দূরত্ব নির্ণয় করেন। বর্তমানে পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব প্রায় ৩ লক্ষ ৮৪ হাজার কিলোমিটার। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি বছর চাঁদ প্রায় ৩.৮ সেন্টিমিটার হারে পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এটি হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো পরিবর্তন নয়, বরং কোটি কোটি বছর ধরে চলমান একটি ধীর প্রক্রিয়া। এর মানে, পৃথিবী এবং চাঁদের মধ্যেকার এই দূরত্ব স্থির নয়।
ধারণা করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে চাঁদ পৃথিবী থেকে আরও অনেক দূরে চলে যাবে। এর ফলে পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়তে পারে। কারণ পৃথিবীতে প্রাণের বিকাশের জন্য চাঁদের অবস্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানী স্টিফেন ডিকারবি জানান, জোয়ার-ভাটার শক্তি এবং কৌণিক ভরবেগের কারণে চাঁদ পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। সূর্য ও চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবে পৃথিবীতে জোয়ার-ভাটার সৃষ্টি হয়। চাঁদের আকর্ষণে পৃথিবীর যে অংশ চাঁদের দিকে থাকে, সেখানকার সমুদ্রের জল ফুলে ওঠে। একইভাবে, বিপরীত দিকেও জোয়ার সৃষ্টি হয়। এতে পৃথিবীর দুই পাশে দুটি জোয়ারের স্ফীতি তৈরি হয়। পৃথিবী তার নিজের অক্ষের উপর প্রতি ২৪ ঘণ্টায় একবার আবর্তন করে। ফলে এই জোয়ারের স্ফীতি চাঁদের আকর্ষণের চেয়ে সামান্য এগিয়ে থাকে। পৃথিবীর আবর্তন গতির কারণে এই স্ফীতি চাঁদকে সামনের দিকে ঠেলে দেয়, যার ফলে চাঁদ অতিরিক্ত শক্তি অর্জন করে এবং তার কক্ষপথ সামান্য প্রসারিত করে।
জোয়ারের স্ফীতি যখন চাঁদকে সামনে টেনে নেয়, তখন চাঁদও পাল্টা টানে পৃথিবীর আবর্তন গতিকে কিছুটা মন্থর করে। এর ফলে পৃথিবীর আবর্তন গতি ধীরে ধীরে কমছে এবং দিনের দৈর্ঘ্য প্রতি শতাব্দীতে প্রায় ২.৩ মিলিসেকেন্ড করে বাড়ছে।
এই পুরো প্রক্রিয়াটি পদার্থবিজ্ঞানের কৌণিক ভরবেগের সংরক্ষণ নীতির উপর নির্ভরশীল। এই নীতি অনুযায়ী, একটি আবদ্ধ ব্যবস্থার মোট কৌণিক ভরবেগ অপরিবর্তিত থাকে। যখন পৃথিবীর আবর্তন গতির কৌণিক ভরবেগ কমে যায়, তখন চাঁদের কক্ষপথের কৌণিক ভরবেগ বৃদ্ধি পায়। আর কক্ষপথের কৌণিক ভরবেগ বাড়লে চাঁদ পৃথিবী থেকে দূরে সরে যায়।
বিজ্ঞানীদের তথ্য অনুযায়ী, চাঁদ যে হারে দূরে সরে যাচ্ছে, তাতে এখনই বিপদের কোনো আশঙ্কা নেই। তবে কোটি কোটি বছর পর এর ফলে পৃথিবীতে দিনের দৈর্ঘ্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে এবং জোয়ার-ভাটার তীব্রতাও কমে যাবে। এই বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া শুধু চাঁদ ও পৃথিবীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, মহাবিশ্বের অন্যান্য গ্রহ এবং তাদের উপগ্রহের মধ্যেও এমন প্রবণতা দেখা যায়।
বিজ্ঞানীরা চাঁদের পৃষ্ঠে বিশেষ প্রতিফলক স্থাপন করেছেন। লেজার রশ্মি পাঠিয়ে তারা চাঁদের সঠিক দূরত্ব পরিমাপ করেন। ১৯৬৯ সালে অ্যাপোলো ১১ মিশনে এই প্রতিফলক স্থাপন করা হয়েছিল। সেই পরিমাপ থেকেই জানা যায় যে চাঁদ ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, চাঁদ যে গতিতে দূরে সরে যাচ্ছে, তাতে আপাতত কোনো বিপদ নেই। তবে চাঁদের ক্রমশ দূরে সরে যাওয়ার এই প্রক্রিয়া ভবিষ্যতে পৃথিবীর ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে কি না, তা নিয়ে গবেষণা অব্যাহত রয়েছে।
সূত্র: এনডিটিভি
খবরওয়ালা/টিএসএন