খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারি ২০২৬
দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির পরিধি বিস্তৃত করতে এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনতে প্রথমবারের মতো ‘ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক’ বা ‘মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই খাতের তদারকি ও লাইসেন্স প্রদানের চূড়ান্ত দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তথা বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর। মূলত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন এবং সামাজিক ব্যবসার প্রসার ঘটানোই এই বিশেষায়িত ব্যাংকিং ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য।
মূলধন কাঠামো ও মালিকানা বিন্যাস
‘মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর চূড়ান্ত খসড়া অনুযায়ী, এই ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি মজবুত করতে মূলধনের পরিমাণ আগের প্রস্তাবনার তুলনায় বাড়ানো হয়েছে। ব্যাংকটির অনুমোদিত মূলধন হবে ৫০০ কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন হবে ২০০ কোটি টাকা। মালিকানার ক্ষেত্রে একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য রাখা হয়েছে—পরিশোধিত মূলধনের ৬০ শতাংশ জোগান দেবেন ব্যাংকের ঋণগ্রহীতা-শেয়ারমালিকরা, আর বাকি ৪০ শতাংশ আসবে উদ্যোক্তা পক্ষ থেকে। এই ব্যাংকগুলো মূলত লাভজনক প্রতিষ্ঠান হওয়ার চেয়ে ‘সামাজিক ব্যবসা’ (Social Business) হিসেবে পরিচালিত হবে।
প্রস্তাবিত ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংকের গঠন ও মূলধন সংক্রান্ত তথ্যাবলি নিচের সারণিতে তুলে ধরা হলো:
| বিষয়ের ক্ষেত্র | বিস্তারিত বিবরণ |
|---|---|
| নিয়ন্ত্রক সংস্থা | বাংলাদেশ ব্যাংক (তদারকি ও লাইসেন্সিং)। |
| অনুমোদিত মূলধন | ৫০০ কোটি টাকা। |
| পরিশোধিত মূলধন | ২০০ কোটি টাকা। |
| মালিকানা কাঠামো | ৬০% ঋণগ্রহীতা-শেয়ারমালিক, ৪০% উদ্যোক্তা। |
| পরিচালনা পর্ষদ | ১০ সদস্যের (৪ জন ঋণগ্রহীতা প্রতিনিধি, ২ জন স্বতন্ত্র)। |
| ভৌগোলিক পরিধি | এক বা একাধিক জেলা, বিভাগ অথবা সমগ্র বাংলাদেশ। |
| আইনি বাধ্যবাধকতা | ব্যাংক কোম্পানি আইন ও কোম্পানি আইন ১৯৯৪ প্রযোজ্য হবে। |
| বিশেষ বৈশিষ্ট্য | পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে পারবে না (শেয়ার কেনাবেচা নিষিদ্ধ)। |
পরিচালনা পর্ষদ ও তদারকি ব্যবস্থা
প্রস্তাবিত এই ব্যাংকের পর্ষদ হবে ১০ সদস্যের। এর মধ্যে ৪ জন পরিচালক নির্বাচিত হবেন ঋণগ্রহীতা-শেয়ারমালিকদের মধ্য থেকে, যা সাধারণ ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। বাংলাদেশ ব্যাংক ২ জন স্বতন্ত্র পরিচালক মনোনীত করবে এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদাধিকারবলে পর্ষদে থাকলেও তাঁর কোনো ভোটাধিকার থাকবে না। এই কাঠামো নিশ্চিত করবে যাতে প্রান্তিক মানুষের স্বার্থ সংরক্ষিত থাকে।
ক্ষুদ্রঋণ খাতের বর্তমান চিত্র ও প্রেক্ষাপট
বর্তমানে বাংলাদেশে এনজিওগুলোর মাধ্যমে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৬৮৩টি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের সদস্য সংখ্যা ৩ কোটি ২৩ লাখ, যার ৯১ শতাংশই নারী। এই বিশাল খাতের ঋণের স্থিতি প্রায় ১ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের দর্শন অনুযায়ী, জামানতবিহীন এই ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে তরুণ উদ্যোক্তাদের বিকাশে এই ব্যাংকগুলো নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
চ্যালেঞ্জ ও বিশেষজ্ঞ মত
সরকারের এই উদ্যোগকে ক্রেডিট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফোরামের (সিডিএফ) মতো সংগঠনগুলো স্বাগত জানালেও, শীর্ষ ১০টি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান (যেমন ব্র্যাক, আশা, টিএমএসএস) কিছু বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, উচ্চ পরিশোধিত মূলধন ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য লাইসেন্স নেওয়া কঠিন করে তুলতে পারে। তবে অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরীর মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে তদারকি আসা ইতিবাচক, তবে শুরুতে সীমিত আকারে লাইসেন্স দিয়ে কার্যক্রমের গুণগত মান পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
প্রস্তাবিত এই অধ্যাদেশটি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হয়েছে। উপদেষ্টা পরিষদের অনুমোদনের পর এটি অধ্যাদেশ আকারে জারি হলে দেশে ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংকিংয়ের নতুন এক অধ্যায় শুরু হবে।