খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬
প্রশান্ত মহাসাগর, ভারত মহাসাগর এবং আর্কটিক মহাসাগরের বিস্তীর্ণ জলরাশিতে চীন একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সুপরিকল্পিত সামুদ্রিক অভিযান চালাচ্ছে বলে বিভিন্ন সামুদ্রিক বিশ্লেষণ ও জাহাজ চলাচলের তথ্য থেকে জানা গেছে। এই অভিযানের মূল লক্ষ্য হলো সমুদ্রের তলদেশের অত্যন্ত সূক্ষ্ম ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি করা এবং পানির নিচে একটি শক্তিশালী নজরদারি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর মাধ্যমে চীন সম্ভাব্য সাবমেরিন যুদ্ধক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের তুলনায় কৌশলগত সুবিধা অর্জনের চেষ্টা করছে।
নৌবিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক সাবমেরিন যুদ্ধ মূলত নির্ভর করে সমুদ্রের তলদেশ সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান, পানির তাপমাত্রা, লবণাক্ততা এবং স্রোতের গতিবিধির ওপর। এই তথ্যগুলো না থাকলে পানির নিচে কার্যকরভাবে সাবমেরিন পরিচালনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
চীনের একটি শীর্ষ সামুদ্রিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অধীন গবেষণা জাহাজ ‘দং ফাং হং–৩’ ২০২৪ ও ২০২৫ সালে একাধিকবার তাইওয়ান, গুয়াম এবং ভারত মহাসাগরের কৌশলগত অঞ্চলের কাছাকাছি এলাকায় নেভিগেশন করেছে বলে জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। এসব এলাকা যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো গবেষণা জাহাজ যখন একই এলাকায় বারবার সমান্তরালভাবে চলাচল করে, তখন সাধারণত তা সমুদ্রতলের উচ্চ-নির্ভুল মানচিত্র তৈরির ইঙ্গিত দেয়। এই পদ্ধতিতে পানির নিচের ভূপ্রকৃতি, পাহাড়-পর্বত এবং গভীরতার পরিবর্তন অত্যন্ত নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়।
চীনের এই কার্যক্রম একক কোনো জাহাজ বা প্রকল্পে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটি কয়েক ডজন গবেষণা জাহাজ এবং শত শত সেন্সরের সমন্বয়ে গঠিত একটি বৃহৎ নেটওয়ার্কের অংশ। বিভিন্ন সামুদ্রিক নথি ও জাহাজের গতিবিধি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অন্তত আটটি জাহাজ সরাসরি সমুদ্রের তলদেশ মানচিত্রায়নের কাজে যুক্ত ছিল এবং আরও অনেক জাহাজে একই ধরনের উন্নত প্রযুক্তি স্থাপন করা ছিল।
| অঞ্চল | কৌশলগত গুরুত্ব | কার্যক্রমের ধরন |
|---|---|---|
| তাইওয়ান সংলগ্ন জলসীমা | সামরিক উত্তেজনাপূর্ণ এলাকা | সাবমেরিন নজরদারি ও মানচিত্রায়ন |
| গুয়ামের আশপাশ | যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান নৌঘাঁটি | গভীর সমুদ্র পর্যবেক্ষণ |
| মালাক্কা প্রণালি প্রবেশমুখ | বিশ্ব বাণিজ্য রুট | স্রোত ও তলদেশ বিশ্লেষণ |
| ভারত মহাসাগর | জ্বালানি সরবরাহ পথ | সেন্সর নেটওয়ার্ক স্থাপন |
| আর্কটিক অঞ্চল | ভবিষ্যৎ সামুদ্রিক প্রভাব ক্ষেত্র | প্রাথমিক জরিপ ও তথ্য সংগ্রহ |
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিস্তৃত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে চীন সাবমেরিন চলাচলের জন্য নিরাপদ পথ নির্ধারণ, শত্রু সাবমেরিন শনাক্তকরণ এবং পানির নিচে সেন্সর ও অস্ত্র মোতায়েনের সক্ষমতা অর্জন করছে।
চীনের সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, এসব জাহাজ মূলত সমুদ্র গবেষণা, জলবায়ু বিশ্লেষণ এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ পর্যবেক্ষণে নিয়োজিত। তবে সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই বেসামরিক গবেষণার আড়ালে রয়েছে সুদূরপ্রসারী সামরিক কৌশল, যা ‘বেসামরিক ও সামরিক সংমিশ্রণ’ নীতির অংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর একাধিক কর্মকর্তাও মনে করেন, চীনের এই কার্যক্রম সাবমেরিন যুদ্ধক্ষেত্রে ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তন করতে পারে। বিশেষ করে পানির নিচের ভূপ্রকৃতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য চীনা সাবমেরিনগুলোকে আরও গোপন ও কার্যকরভাবে চলাচল করতে সাহায্য করবে।
অস্ট্রেলিয়া ও সিঙ্গাপুরের সাবেক নৌবিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করেছেন, এই মাত্রার সমুদ্র জরিপ শুধুমাত্র খনিজ অনুসন্ধান বা বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য করা হচ্ছে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি সামুদ্রিক শক্তি প্রতিষ্ঠার কৌশল।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে সমুদ্রের নিচের তথ্য ও নিয়ন্ত্রণে একচ্ছত্র সুবিধা ভোগ করলেও চীনের এই বিস্তৃত নেটওয়ার্ক সেই ভারসাম্য দ্রুত বদলে দিচ্ছে। এর ফলে ভবিষ্যতে প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সামুদ্রিক প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।