খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫
৬০ বছর বয়সী প্রফেসর মার্টিন গ্রিফিথস লন্ডনের ইস্ট অ্যান্ডে পরিবারের সঙ্গে থাকেন। তিনি রয়্যাল হাসপাতাল, হোয়াইটচ্যাপেল-এর এনএইচএস ট্রমা সার্জন। কিশোর গ্যাং কালচার, মাদক ব্যবসা এবং ছুরি ও গুলির আঘাতে আহত তরুণদের চিকিৎসা করা তার দৈনন্দিন দায়িত্ব। ইউরোপের ব্যস্ততম ট্রমা সেন্টারগুলোর একটিতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকা গ্রিফিথস সহিংসতা রোধে প্রথম হাসপাতাল-ভিত্তিক সেবা চালু করার জন্য সিবিই সম্মানেও ভূষিত হয়েছেন।
কিন্তু গত ৭ সেপ্টেম্বর ছুটি নিয়ে তিনি গাজায় প্রবেশ করেন। বহু বছর আগে যুক্তরাজ্যের মানবিক সংস্থা ‘ইউকে-মেড’-এর সঙ্গে যুক্ত থাকায় দক্ষিণ সুদানের যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর। গাজার সাহায্যের ডাক পেয়ে পরিবার ও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পরামর্শের পর তিনি সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
গাজায় পৌঁছে প্রথম অভিজ্ঞতা সম্পর্কে গ্রিফিথস বলেন, ‘ধূসর ইটের ধুলোয় ঢাকা চাঁদের মতো এক দৃশ্য। বোমার আঘাতে কোনো উঁচু ভবন অবশিষ্ট নেই, মানুষজন শুধু বাঁচার চেষ্টা করছে।’
বর্তমানে তিনি দক্ষিণ গাজার আল মাওয়াসি ক্যাম্পে অবস্থান করছেন। এখানে ইউকে-মেড পরিচালিত দুটি ফিল্ড হাসপাতালের একটি চলছে। এই হাসপাতালে এখন পর্যন্ত প্রায় সাত লাখ চিকিৎসা পরামর্শ, চার হাজারের বেশি অস্ত্রোপচার এবং শত শত নবজাতকের জন্ম হয়েছে।
হাসপাতালে আসা রোগীদের অধিকাংশই বিস্ফোরণ ও গুলির আঘাতে ক্ষতবিক্ষত। কেউ কেউ দিন বা সপ্তাহ পেরিয়ে যাওয়া পুরোনো সংক্রমিত ক্ষত নিয়ে আসছেন। ক্ষুধা, অপুষ্টি এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে চিকিৎসা কার্যক্রম আরও জটিল হয়ে উঠেছে। গ্রিফিথস বলেন, ‘অঙ্গহানি, গুলিবিদ্ধ হওয়া, সড়ক দুর্ঘটনা—সবই এখানে নিত্যদিনের ঘটনা। ভয়ংকর আঘাতপ্রাপ্ত অনেক শিশুকেও আনা হচ্ছে। তাদের কেউ পরিবার হারিয়েছে, কেউ একা হয়ে গেছে। এদের যন্ত্রণাদায়ক চিৎকার শোনার পর নিজেকে সামলে নেওয়া কঠিন।’
ফিল্ড হাসপাতালে বর্তমানে ১৫ জন ব্রিটিশ চিকিৎসক ও কর্মীসহ প্রায় ৫০০ স্থানীয় মানুষ কাজ করছেন। স্থানীয় কর্মীদের অবস্থাও ভীষণ—অনেকেই পরিবার হারিয়েছেন, দুই বছরের মধ্যে অনেকে ৩০ কেজি পর্যন্ত ওজন হারিয়েছেন। তবু তারা প্রতিদিন দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। গ্রিফিথস বলেন, ‘ওরা দুর্দান্ত মানুষ। প্রতিদিনের ধ্বংসযজ্ঞের মাঝেও অবিশ্বাস্য সাহস নিয়ে কাজ করেন।’
গাজার সাধারণ মানুষও চিকিৎসা পেয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছেন। তবে শীতের আগে ওষুধ, ব্যথানাশক, অ্যান্টিবায়োটিকসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কমে আসছে। আশ্রয় সংকুচিত হচ্ছে, আর রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।
গ্রিফিথসের জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে বোমা বিস্ফোরণ এখন নিত্যদিনের ঘটনা। তিনি বলেন, ‘বিস্ফোরণ শুনে যখন বুঝি সেটা আমার দিকে নয়। তখন কিছুটা স্বস্তি লাগে, আবার সঙ্গে সঙ্গে মনে হয়—কারও ওপর ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এসেছে।’
সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও হাসপাতাল কর্মীরা গ্রিফিথসকে এক বেলা গরম খাবার দেন। যদি পথ নিরাপদ থাকে, আগামী অক্টোবর লন্ডনে ফেরার পরিকল্পনা করছেন তিনি। ফিরে গিয়ে আবার এনএইচএস ট্রমা সেন্টারে দায়িত্ব নেবেন। গ্রিফিথস বলেন, ‘আমি আর কোনো দিন এনএইচএস নিয়ে অভিযোগ করব না।’
গাজার আল মাওয়াসি তাঁবু শিবির হাসপাতাল থেকে তিনি দ্য টাইমসের সাংবাদিককে বলেন, ‘আজ কিছুটা শান্ত। অস্ত্রোপচার শেষ করে কয়েকজন রোগী দেখে হয়তো ঘুমাতে পারব। কিন্তু বাইরে তাকালেই মনে হয়—এ যেন কেয়ামতের দৃশ্য।’
খবরওয়ালা/শরিফ