খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ৩ আগস্ট ২০২৫
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় চরম খাদ্য সংকটের মধ্যে অনাহার ও অপুষ্টিতে ভুগে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোর মারা গেছে। তার নাম আতেফ আবু খাতের।
শনিবার (২ আগস্ট) গাজা শহরের আল-শিফা হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। আল–জাজিরাকে হাসপাতালটির একটি সূত্র তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে।
আতেফের স্বজন এবং চিকিৎসাকর্মীরা জানিয়েছেন, তার আগে কোনো শারীরিক অসুস্থতা ছিল না। কিন্তু ইসরায়েলের অবরোধের কারণে খাবারের অভাবে ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে সে। অবশেষে তীব্র অপুষ্টির কারণে মারা যায় কিশোরটি।
আল–জাজিরার গাজা প্রতিনিধি হানি মাহমুদ বলেন, ‘আতেফ স্থানীয়ভাবে খেলাধুলার একজন চ্যাম্পিয়ন ছিল। কিন্তু পর্যাপ্ত খাবার না পাওয়ায় তার ওজন কমতে শুরু করে। এরপর মারাত্মক অপুষ্টির শিকার হয়ে শেষ পর্যন্ত প্রাণ হারায়। গাজায় এমন হাজার হাজার মানুষের মধ্যে আতেফ একজন মাত্র।’
আল–জাজিরার যাচাই করা একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, আতেফের পরিবার তাকে শেষ বিদায় জানাচ্ছে। তার শীর্ণকায় মরদেহ দেখা যায়, যেখানে মুখটি ক্যামেরা থেকে আড়াল করে রাখা হয়েছে। ভিডিওতে আরও দেখা যায়, এক আত্মীয় তার পাঁজরের হাড় গুনে দেখাচ্ছেন—যা খালি চোখেই বোঝা যাচ্ছিল।
পরিবার জানায়, মৃত্যুর সময় আতেফের ওজন ছিল মাত্র ২৫ কেজি। অথচ আগে তার ওজন ছিল ৭০ কেজি। একটি নয় বছরের শিশুর গড় ওজন সাধারণত যতটা হয়, আতেফের শরীর ঠিক ততটাই হালকা হয়ে গিয়েছিল। তার গালে কোনো চর্বি ছিল না, মুখমণ্ডলের হাড়গুলো স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছিল।
ভিডিওটি নিজের ইনস্টাগ্রামে শেয়ার করেছেন গাজার সাংবাদিক উইসাম শাবাত। তিনি লিখেছেন, ‘দীর্ঘদিন না খেয়ে এবং চিকিৎসা না পেয়ে আতেফের দেহে নানা জটিলতা তৈরি হয়। হাসপাতালে আনার সময় তার অবস্থা ছিল অত্যন্ত সংকটাপন্ন। শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।’
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্যমতে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েলি আগ্রাসন শুরুর পর থেকে অনাহার ও অপুষ্টিতে ১৬৯ জন ফিলিস্তিনি মারা গেছেন। এর মধ্যে ৯৩ জনই শিশু।
ত্রাণে বাধা, সীমান্ত খুলে দেওয়ার আহ্বান
জাতিসংঘসহ মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলো বলছে, গাজায় এখনো প্রয়োজনীয় ত্রাণ ঢুকতে পারছে না। কিছুটা শিথিলতা এলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। ইসরায়েল দাবি করেছে, তারা সাহায্য কার্যক্রম জোরদার করেছে। এমনকি উড়োজাহাজ থেকে খাবার ফেলার ব্যবস্থাও করছে। তবে মানবিক সংস্থাগুলো একে “ঝুঁকিপূর্ণ ও অকার্যকর” বলে আখ্যায়িত করেছে।
তাদের দাবি, ‘গাজার সব সীমান্ত ক্রসিং খুলে দিতে হবে, যাতে যথাযথভাবে ত্রাণ পৌঁছানো যায়।’
জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএর প্রধান ফিলিপ লাজারিনি বলেন, ‘গাজায় যে মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষ চলছে, তা জাতিসংঘের ত্রাণ সরিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সমর্থিত বিতর্কিত সংস্থা জিএইচএফকে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইসরায়েল জাতিসংঘসহ মানবিক সংস্থাগুলোর সহায়তা ঠেকাতে সক্রিয়ভাবে বাধা দিচ্ছে। এটি ফিলিস্তিনিদের শাস্তি দেওয়ার একটি পরিকল্পিত কৌশল।’
লাজারিনি তার এক্স অ্যাকাউন্টে আরও লিখেছেন, ‘আর সময় নষ্ট করা যাবে না। সীমান্তগুলো নিঃশর্তভাবে খুলে দেওয়ার জন্য এখনই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’
ধুঁকে ধুঁকে মরছে শিশুরা
আল–জাজিরার গাজার সাংবাদিক হিন্দ খৌদারি জানিয়েছেন, গাজাজুড়ে হাজারো পরিবার এখন মরিয়া হয়ে খাবারের খোঁজ করছে। দেইর আল-বালাহ অঞ্চল থেকে তিনি বলেন, ‘ইসরায়েলের বাধার কারণে শিশুসহ অনেকেই ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর দিকে এগোচ্ছে।’
তিনি তুলে ধরেন মিস্ক আল-মাধুন নামের পাঁচ বছর বয়সী অপুষ্ট শিশু কন্যার কথা। শিশুটিকে খাওয়ানোর মতো কিছুই নেই পরিবারের কাছে। ‘আমরা এমন অনেক মা-বাবার সঙ্গে কথা বলেছি, যারা বাধ্য হয়ে শুধু পানি খাওয়াচ্ছেন তাঁদের শিশুদের। কারণ দুধ বা বিকল্প কিছু তাদের হাতে নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘ফিলিস্তিনি মা-বাবারা গরমে দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে খাবার সংগ্রহ করতে যাচ্ছেন। কেউ কেউ জিএইচএফের বিতরণকেন্দ্রে গেলেও সেখানে হামলার শিকার হচ্ছেন বা খালি হাতে ফিরছেন।’
‘ভয়াবহ রূপ নিয়েছে দুর্ভিক্ষ’
আন্তর্জাতিক ক্ষুাবিষয়ক পর্যবেক্ষণ সংস্থা আইপিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজার বেশির ভাগ এলাকায় খাদ্যের অভাব এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা স্পষ্টভাবে দুর্ভিক্ষের সংজ্ঞায় পড়ে।
তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘নিরবিচারে হামলা, গণহারে বাস্তুচ্যুতি, ত্রাণ প্রবেশে কঠোর নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যসেবার ধস—সব মিলিয়ে গাজায় পরিস্থিতি ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী পর্যায়ে পৌঁছেছে।’
সূত্র: আল–জাজিরা, ইউএনআরডব্লিউএ, গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, IPC
খবরওয়ালা/এসআই