খবরওয়ালা আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: 22শে বৈশাখ ১৪৩২ | ৫ই মে ২০২৫ | 1149 Dhu al-Hijjah 5
ইসরায়েলের নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা গাজায় হামাসের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান জোরদার এবং পুরো গাজা দখলের পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে। রবিবার (৪ মে) এক বৈঠকে গাজা দখলের কৌশলগত পরিকল্পনার অনুমোদন দেওয়া হয়। বিবিসির খবর।
এক ইসরায়েলি কর্মকর্তার বরাতে জানা গেছে, এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গাজার ভূখণ্ড দখল করে সেখানে স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ কায়েম করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিকল্পনার আওতায় গাজার ২১ লাখ মানুষকে দক্ষিণে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত, যা আগেই চলমান মানবিক সংকটকে আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এই পরিকল্পনাকে ‘ভালো পরিকল্পনা’ বলে উল্লেখ করেছেন, কারণ এতে হামাসকে পরাজিত করা এবং অবশিষ্ট জিম্মিদের ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য পূরণ হবে বলে তিনি মনে করেন।
এ ছাড়া মন্ত্রিসভা ব্যক্তিমালিকানাধীন কোম্পানির মাধ্যমে মানবিক সহায়তা বিতরণে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে, যা গত দুই মাসের অবরোধের অবসান ঘটাতে পারে। জাতিসংঘ জানিয়েছে, এই অবরোধের কারণে গাজায় ভয়াবহ খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে। তবে জাতিসংঘ ও অন্যান্য মানবিক সংস্থাগুলো বলছে, ইসরায়েলের প্রস্তাব মানবিক নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন, এবং তারা এতে সহযোগিতা করবে না।
হামাস এই প্রস্তাবকে ‘রাজনৈতিক ব্ল্যাকমেইল’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
গত ১৮ মার্চ, ইসরায়েলের দুই মাসের যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার পর গাজায় আবার হামলা শুরু হয়। এরপর রোববার রাতে নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা বৈঠকে বসে। সোমবার এক ইসরায়েলি কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানান, সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল আয়াল যামির যে পরিকল্পনা পেশ করেন, তা মন্ত্রিসভায় সর্বসম্মতভাবে অনুমোদিত হয়।
এই পরিকল্পনায় রয়েছে: গাজার দখল এবং ভূখণ্ডে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখা; সাধারণ জনগণকে দক্ষিণে সরিয়ে দেওয়া; হামাস যাতে মানবিক সহায়তা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে তা নিশ্চিত করা এবং এবং হামাসের ওপর শক্তিশালী সামরিক হামলা চালানো।
ইসরায়েলি গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, পরিকল্পনাটি ধাপে ধাপে কয়েক মাস ধরে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রথম ধাপে গাজার আরও কিছু এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এবং সীমান্ত বরাবর ইসরায়েলের ‘বাফার জোন’ সম্প্রসারণ করা হবে। এতে করে হামাসের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ও জিম্মি মুক্তি আলোচনায় ইসরায়েলের কৌশলগত সুবিধা বাড়বে।
ইসরায়েলি নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার সদস্য জিভ অ্যালকিন গণমাধ্যমে বলেন, ১৩-১৬ মে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য সফরের আগেই যদি হামাস বুঝতে পারে ইসরায়েল সত্যিই কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে, তাহলে নতুন জিম্মি মুক্তির সুযোগ থাকতে পারে।
রবিবার (৪ মে) নৌ ঘাঁটিতে বিশেষ বাহিনীর সঙ্গে সাক্ষাতে সেনাপ্রধান জানান, গাজায় অভিযান বিস্তৃত করতে দশ হাজারের বেশি রিজার্ভ সেনা ডাকা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা চাপ বাড়াচ্ছি যাতে আমাদের মানুষদের ঘরে ফিরিয়ে আনতে পারি এবং হামাসকে পরাজিত করতে পারি। গাজার আরও এলাকায় আমরা অভিযান চালাব এবং সন্ত্রাসী অবকাঠামো—উপরিতল ও ভূগর্ভস্থ—ধ্বংস করব।’
তবে সমালোচকরা বলছেন, এই কৌশল ব্যর্থ, কারণ অভিযান পুনরায় শুরু হওয়ার পর ছয় সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও ৫৯ জন জিম্মির একজনকেও মুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
জিম্মিদের পরিবারের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন ‘হোস্টেজেস অ্যান্ড মিসিং ফ্যামিলিস ফোরাম’ বলেছে, সরকারের এই পরিকল্পনা ‘ভূখণ্ডকে জিম্মিদের চেয়ে বেশি অগ্রাধিকার’ দিচ্ছে, যা ইসরায়েলের ৭০ শতাংশ জনগণের মতামতের বিরুদ্ধে।
ইসরায়েলি কর্মকর্তা আরও জানান, মন্ত্রিসভা মানবিক সহায়তা বিতরণের একটি বিকল্প ব্যবস্থার অনুমোদন দিয়েছে, যাতে হামাসের নিয়ন্ত্রণ ব্যাহত হয় এবং তাদের সরকার পরিচালনার সক্ষমতা ধ্বংস করা যায়।
একইদিনে জাতিসংঘের ‘হিউম্যানিটারিয়ান কান্ট্রি টিম’ (এইচসিটি) জানায়, ইসরায়েল বিদ্যমান মানবিক সহায়তা ব্যবস্থা বন্ধ করতে চাইছে এবং নতুনভাবে ইসরায়েলি সামরিক শর্তে মানবিক ত্রাণ বিতরণে চাপ দিচ্ছে।
এই প্রস্তাবনা বাস্তবায়িত হলে গাজার বহু মানুষ—বিশেষ করে যাঁরা শারীরিকভাবে অক্ষম বা ঝুঁকিপূর্ণ—তাঁরা সহায়তা থেকে বঞ্চিত হবেন বলে সতর্ক করে এইচসিটি।
তারা বলেছে, ‘এটি মৌলিক মানবিক নীতিমালার পরিপন্থি এবং একটি সামরিক কৌশলের অংশ হিসেবে জীবন-রক্ষাকারী দ্রব্যের নিয়ন্ত্রণকে চাপে পরিণত করার মতো পরিকল্পনা। এটি বিপজ্জনক, কারণ এতে বেসামরিক মানুষকে সামরিক অঞ্চলে যেতে বাধ্য করা হচ্ছে, যা তাঁদের এবং মানবিক সহায়তাকর্মীদের জীবন হুমকিতে ফেলছে এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতিকে আরও গভীরতর করছে।’
গত ২ মার্চ থেকে ইসরায়েল গাজায় মানবিক সহায়তা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে রেখেছে। ফলে জাতিসংঘ বলছে, খাদ্য, ওষুধ, টিকা এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের মারাত্মক ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
ইসরায়েল দাবি করছে, তারা আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলছে এবং সহায়তার কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু জাতিসংঘ বলছে, প্রায় পুরো গাজা জনগোষ্ঠী বাস্তুচ্যুত, আর আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় ইসরায়েলের দায়িত্ব এসব মানুষের জন্য সহায়তা নিশ্চিত করা।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নজিরবিহীন সীমান্ত আক্রমণে প্রায় ১,২০০ ইসরায়েলি নিহত হয় এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করে নেওয়া হয়। এরপর থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলের পাল্টা অভিযানে গাজায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৫২,৫৬৭ জন নিহত হয়েছে, যার মধ্যে শেষ ছয় সপ্তাহেই নিহত হয়েছে ২,৪৫৯ জন (তথ্য: হামাস-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়)।
সূত্র: বিবিসি
খবরওয়ালা/আরডি