খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ৭ জুন ২০২৬
চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলায় প্রথম শ্রেণির এক ১১ বছর বয়সী শিশু শিক্ষার্থীকে নির্মমভাবে যৌন নির্যাতনের (বলাৎকার) অভিযোগ উঠেছে এক মাদ্রাসা শিক্ষকের বিরুদ্ধে। এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার অভিযোগে অভিযুক্ত শিক্ষক আল-আমিনকে (২৮) দ্রুত অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করেছে স্থানীয় থানা পুলিশ। এই ঘটনাটি প্রকাশ পাওয়ার পর পুরো সন্দ্বীপ উপজেলা জুড়ে তীব্র ক্ষোভ এবং নিন্দার ঝড় বইছে। স্থানীয় বাসিন্দারা এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত আল-আমিন উপজেলার সারিকাইত বাংলাবাজার এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘মারকাজুল নুর আল ইসলামিয়া মাদ্রাসা’র প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। তিনি উপজেলার মাইটভাঙ্গা ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ছানা উল্লার ছেলে। ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়ার আড়ালে তিনি এই ধরনের অনৈতিক ও অপরাধমূলক কার্যক্রম চালিয়ে আসছিলেন বলে ভুক্তভোগী পরিবার দাবি করেছে।
যেভাবে ঘটনাটি সামনে আসে
মামলার এজাহার ও ভুক্তভোগী পরিবারের সূত্রে জানা গেছে, পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে মাদ্রাসায় টানা ১২ দিনের ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল। ছুটি শেষে গত ৬ জুন শিশুটিকে পুনরায় মাদ্রাসায় পাঠানোর জন্য তার মা প্রস্তুতি নেন এবং তাকে যাওয়ার জন্য চাপ দেন। কিন্তু অবুঝ শিশুটি মাদ্রাসায় ফিরে যাওয়ার কথায় চরম আতঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং সেখানে যেতে তীব্র অনীহা ও অস্বীকৃতি প্রকাশ করে। একপর্যায়ে সে কান্নায় ভেঙে পড়ে।
মাদ্রাসায় যাওয়ার প্রতি শিশুর এমন অস্বাভাবিক আচরণ ও তীব্র ভীতি দেখে মায়ের মনে সন্দেহের দানা বাঁধে। পরবর্তীতে মায়ের দীর্ঘ জেরা এবং আশ্বাসের মুখে শিশুটি তার সাথে ঘটে যাওয়া নির্মম নির্যাতনের বিবরণ দেয়। শিশুটি জানায়, গত ৮ মে আসরের নামাজের পর প্রধান শিক্ষক আল-আমিন তাকে কৌশলে অফিস কক্ষের পাশে অবস্থিত নিজের ব্যক্তিগত শয়নকক্ষে ডেকে নেন। সেখানে ঘরের দরজা বন্ধ করে দিয়ে শিশুটিকে নানা ধরনের ভয়ভীতি ও হুমকি প্রদর্শন করা হয়। এরপর অবুঝ শিশুটির ওপর জোরপূর্বক পাশবিক যৌন নির্যাতন চালানো হয়।
নির্যাতনের শিকার শিশুটি কান্নাকাটি করতে চাইলে অভিযুক্ত শিক্ষক ঘটনাটি কাউকে না বলার জন্য কঠোর হুমকি দেন। প্রকাশ করলে তাকে মাদ্রাসা থেকে বের করে দেওয়া এবং প্রাণে মেরে ফেলার ভয়ও দেখানো হয়। শিশুটির অভিযোগ, এটিই প্রথম নয়; এর আগেও বিভিন্ন সময়ে ওই শিক্ষক তাকে একাধিকবার তার কক্ষে ডেকে নিয়ে একইভাবে নির্যাতন করেছেন। কিন্তু তীব্র ভয়, সামাজিক লোকলজ্জা এবং শিক্ষকের হুমকির কারণে এতদিন সে এই বিষয়টি পরিবারের কাউকে বলার সাহস পায়নি।
আইনি পদক্ষেপ ও পুলিশের বক্তব্য
কোমলমতি সন্তানের মুখে শিক্ষকের এই পৈশাচিক ও নির্মম নির্যাতনের বিবরণ শুনে স্তম্ভিত ও স্তব্ধ হয়ে পড়েন মা। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং প্রতিবেশীদের জানান। ঘটনার ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরে স্থানীয় বাসিন্দারা পরিবারটিকে আইনি সহায়তার পরামর্শ দেন। এরপর শিশুটির মা সন্দ্বীপ থানায় গিয়ে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক আল-আমিনের বিরুদ্ধে একটি লিখিত মামলা দায়ের করেন।
অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনা করে সন্দ্বীপ থানা পুলিশ তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। মামলার পর পরই পুলিশ উপজেলার সংশ্লিষ্ট এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে অভিযুক্ত শিক্ষক আল-আমিনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়।
সন্দ্বীপ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সুজন হালদার ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, “ভুক্তভোগী শিশুর মায়ের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন (সংশোধিত ২০২৫)-এর ৯(১) ধারায় একটি সুনির্দিষ্ট মামলা দায়ের করা হয়েছে। ঘটনার ভয়াবহতা ও সংবেদনশীলতা বিবেচনা করে আমরা দ্রুততম সময়ের মধ্যে আসামিকে গ্রেফতার করেছি। এই বিষয়ে আমাদের আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। ভুক্তভোগী শিশুর জবানবন্দি গ্রহণ ও প্রয়োজনীয় ডাক্তারী পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় তদন্ত অব্যাহত আছে।”
এদিকে একজন শিক্ষকের এমন নৈতিক স্খলন ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় অভিভাবক মহলে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। সচেতন নাগরিক সমাজ বলছেন, দ্বীনি শিক্ষার পবিত্র স্থানে বসে যারা শিশুদের ওপর এমন নির্যাতন চালায়, তাদের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত।