খবরওয়ালা আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২ জুলাই ২০২৫
গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের চলমান দমন-পীড়ন ও সম্ভাব্য গণহত্যায় সরাসরি ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করছে বেশ কয়েকটি বহুজাতিক কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান। জাতিসংঘের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ৪৮টি করপোরেট সংস্থার নাম উল্লেখ করা হয়েছে, যাদের মধ্যে রয়েছে গুগলের মূল কোম্পানি অ্যালফাবেট ইনক, মাইক্রোসফট, অ্যামাজন সহ আরো এক হাজারের বেশি কোম্পানি।
এই রিপোর্ট জাতিসংঘের বিশেষ দূত ফ্রানচেসকা আলবানিজের দ্বারা প্রস্তুত করা হয়েছে এবং ৩ জুলাই জেনেভায় এক সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত হবে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এই কোম্পানিগুলো আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ইসরায়েলের দখলদার নীতিকে সহায়তা করছে এবং ‘গণহত্যার অর্থনীতির’ অংশ হয়ে উঠেছে।
সেনা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি খাতে কর্পোরেটদের ভূমিকা
ইসরায়েলের যুদ্ধ বিমান এফ-৩৫ কেনার বৃহত্তম অস্ত্র ক্রয় কর্মসূচি অন্তত ১৬০০ কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল। যুক্তরাষ্ট্রের লকহিড মার্টিন এই প্রকল্পের প্রধান সংস্থা। এছাড়া, ইতালির লিওনার্দো এসপিএ সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করে এবং জাপানের এফএএনইউসি রোবোটিক অস্ত্র তৈরি করে।
প্রযুক্তি খাতে মাইক্রোসফট, অ্যালফাবেট ও অ্যামাজন ইসরায়েলের ক্লাউড ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি সরবরাহ করে বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণে সহযোগিতা করছে। আইবিএম ইসরায়েলের সামরিক ও গোয়েন্দা বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে এবং ফিলিস্তিনি বায়োমেট্রিক তথ্য সংরক্ষণ করছে।
প্যালানটির টেকনোলজিস সফটওয়্যার কোম্পানি ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়িয়েছে এবং যুদ্ধক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।
অন্যান্য কর্পোরেট ও প্রযুক্তির দ্বৈত ব্যবহার
কিছু প্রতিষ্ঠান যেমন ক্যাটারপিলার, লিওনার্দো মালিকানাধীন রাডা ইলেকট্রনিকস, দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই, সুইডেনের ভলভো গ্রুপ অবৈধ বসতিতে ভারি যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে দখলদারত্বে সহায়তা করছে।
বুকিং ডট কম ও এয়ারবিএনবি অবৈধ বসতির ঘর ও হোটেলের তালিকা দিয়ে দখলদারত্বকে বৈধতা দিচ্ছে।
এছাড়া, ড্রামন্ড কোম্পানি (যুক্তরাষ্ট্র) ও গ্লেনকোর (সুইজারল্যান্ড) কয়লা সরবরাহ করে ইসরায়েলের বিদ্যুৎ উৎপাদনে অবদান রাখে।
চীনের ব্রাইট ডেইরি অ্যান্ড ফুড ইসরায়েলের বৃহত্তম খাদ্য সংস্থা নুভারের মালিক, যা অবৈধ স্থাপনায় লাভবান হচ্ছে।
মেক্সিকোর নেটাফিম ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠান অর্বিয়ার কাছে পানি প্রযুক্তি সরবরাহ করে।
বিনিয়োগকারীর ভূমিকাও সমালোচিত
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বড় বিনিয়োগ সংস্থা ব্ল্যাকরক ও ভ্যানগার্ড এই প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান বিনিয়োগকারী। ব্ল্যাকরক পালানটিরে ৮.৬%, মাইক্রোসফটে ৭.৮%, অ্যামাজনে ৬.৬% এবং লকহিড মার্টিনে ৭.২% মালিকানা রাখে। ভ্যানগার্ড ক্যাটারপিলারে ৯.৮%, পালানটিরে ৯.১% এবং এলবিট সিস্টেমসে ২% মালিকানা রয়েছে।
ব্যবসায়িক লাভ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্ন
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক অপরাধে অংশগ্রহণ করছে।
ইসরায়েলের সামরিক ব্যয় ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ৬৫% বেড়ে ৪৬৫০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে এবং তেল আবিব স্টক এক্সচেঞ্জে শেয়ারমূল্য রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
অ্যালিয়্যাঞ্জ ও অ্যাক্সাওসহ বড় বিমা সংস্থাগুলো ইসরায়েলের শেয়ার ও বন্ডে বিনিয়োগ করে আর্থিক লাভ করছে, যা মানবিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।
আন্তর্জাতিক আইনি দায় ও জাতিসংঘের আহ্বান
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কর্পোরেট সংস্থাগুলো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন মানতে বাধ্য। রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব দায়িত্ব রয়েছে, যা অমান্য করলে তারা আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের মুখোমুখি হতে পারে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) ইসরায়েলের পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে দখলদারিত্ব বন্ধের পরামর্শমূলক রায় দেয়। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদও ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইসরায়েলের দখলদার কার্যক্রম বন্ধের আহ্বান জানায়।
এলবানিজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই রায় ইসরায়েলের দখলদারতাকে ‘আগ্রাসনের কাজ’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং যারা এই অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলছে তারা আন্তর্জাতিক অপরাধের অংশীদার।
বিশ্বসম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান
জাতিসংঘ রাষ্ট্রগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে, তারা ইসরায়েলের সঙ্গে অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও বিনিয়োগ সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়ন করবে এবং দখলদারতাকে সহায়তা করা থেকে বিরত থাকবে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই প্রতিবেদন কর্পোরেট জগতকে নৈতিক ও আইনি দায়িত্বের প্রতি সতর্ক করেছে এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার রক্ষায় বড় চ্যালেঞ্জ উপস্থাপন করেছে।
সূত্র: আল-জাজিরা
খবরওয়ালা/আরডি