নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: 1শে ভাদ্র ১৪৩২ | ১৬ই আগস্ট ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
ভাবুন তো, কোনো দিকনির্দেশক বোর্ড, মানচিত্র বা স্মার্টফোন ছাড়াই হাজার হাজার কিলোমিটার ভ্রমণ করে নিখুঁতভাবে আপনি গন্তব্যে পৌঁছে গেছেন অনায়াসে, সম্ভব?। মানুষের জন্য এটি প্রায় অসম্ভব, কিন্তু কিছু প্রাণীর কাছে এটি একটি সাধারণ ব্যাপার। প্রকৃতি তাদের এমন অসাধারণ নেভিগেশন ক্ষমতা দিয়েছে যে তারা মহাসাগর, মরুভূমি কিংবা অরণ্য অতিক্রম করেও নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছায়, যেন তাদের শরীরে সুপার-জিপিএস বসানো আছে।
ক্ষুদ্র কীটপতঙ্গ থেকে শুরু করে বিশাল সামুদ্রিক প্রাণী, কিছু প্রজাতি জন্মগতভাবেই এই অদ্ভুত দিকনির্দেশনা ক্ষমতা নিয়ে বেঁচে থাকে। এখানে এমন পাঁচটি প্রাণীর কথা তুলে ধরা হলো, যাদের নেভিগেশন দক্ষতা গুগল ম্যাপসকেও হার মানায়।
স্যামন মাছ
বিশ্বজুড়ে ব্যাপকভাবে চাষ করা হলেও প্রাকৃতিক পরিবেশে স্যামন মাছের নেভিগেশন দক্ষতা অবিশ্বাস্য। জন্মের পর থেকেই এরা পিতামাতার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে একটি ‘চৌম্বক অনুভূতি’ পায়। পরিণত হওয়ার পর এরা হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে সেই একই খাল বা ঝরনায় ফিরে আসে, যেখানে তাদের জন্ম হয়েছিল। গন্তব্য খুঁজে পেতে প্রথমে তারা পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র ব্যবহার করে, আর নদীতে পৌঁছানোর পর ঘ্রাণশক্তি দিয়ে সঠিক জায়গা শনাক্ত করে।
সামুদ্রিক কচ্ছপ
স্যামনের মতো সামুদ্রিক কচ্ছপও পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রকে প্রাকৃতিক কম্পাস হিসেবে ব্যবহার করে। উপকূলের ভিন্ন ভিন্ন অংশে আলাদা চৌম্বক ‘সিগনেচার’ থাকে, আর কচ্ছপ তা মনে রাখে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, হাজার হাজার কিলোমিটার ভ্রমণ শেষে তারা শুধু জন্মস্থানীয় উপকূলে নয়, সেই একই সৈকতে ফিরে আসে, যেখানে তাদের ডিম ফুটেছিল।
ডাং বিটল (গোবর পোকা)
গোবর পোকার নেভিগেশন পদ্ধতি শুনতে যেন সায়েন্স ফিকশন। এরা আকাশের তারা আর মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সির সাহায্যে পথ খুঁজে নেয়। প্রাণীর গোবর দিয়ে বল বানানোর পর এরা এক ধরনের বিশেষ ভঙ্গি বা রীতির মাধ্যমে আকাশ পর্যবেক্ষণ করে। সূর্য, চাঁদ ও গ্যালাক্সির আলো ব্যবহার করে তারা নির্দিষ্ট দিক ঠিক করে নেয়।
হোমিং পায়রা
প্রাচীনকাল থেকেই বার্তা বহনের জন্য ব্যবহৃত হোমিং পায়রা পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রকে ব্যবহার করে পথ চিনে নেয়। আকাশ মেঘলা থাকলে তারা চৌম্বকক্ষেত্রের ওপর নির্ভর করে, আর আকাশ পরিষ্কার থাকলে সূর্যের অবস্থান দেখে গন্তব্য ঠিক করে। সূর্যের গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে তাদের অভ্যন্তরীণ ‘জৈবঘড়ি’ কাজ করে। শুধু তাই নয়, তারা বাতাসে ভেসে আসা গন্ধকে দিকের সঙ্গে যুক্ত করে এক ধরনের ‘গন্ধ মানচিত্র’ও তৈরি করে।
তিমি
ধারণা করা হয়, তিমি পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র অনুভব করতে পারে। এ ক্ষমতার সাহায্যে তারা সমুদ্রের উন্মুক্ত বিস্তীর্ণ পথে হাজার হাজার কিলোমিটার ভ্রমণ করেও পথ হারায় না। হাম্পব্যাক তিমি প্রতিবছর প্রায় ১৬ হাজার কিলোমিটার পাড়ি দেয়—উষ্ণমণ্ডলীয় প্রজননক্ষেত্র থেকে মেরু অঞ্চলের খাদ্যশালায়। শুধু চৌম্বকক্ষেত্রই নয়, সূর্য, তারা কিংবা দূরবর্তী সাগরের শব্দ ব্যবহার করেও তারা দিক নির্ধারণ করে।
প্রকৃতির এই অনন্য ক্ষমতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক না কেন, প্রাণিজগতের স্বাভাবিক বুদ্ধিমত্তার সামনে আমরা এখনো বিস্মিত হয়ে যাই।
খবরওয়ালা/এমএজেড