খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২ জুন ২০২৬
বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম সীমান্তে একটি পরিত্যক্ত মর্টারশেল বিস্ফোরণের ঘটনায় সতনাইং তঞ্চঙ্গ্যা (১২) নামে এক কিশোরের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। আজ মঙ্গলবার বেলা সাড়ে তিনটার দিকে সীমান্তের বাইশফাঁড়ি এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত কিশোরের পরিবার গত পাঁচ-ছয় বছর আগে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সহিংসতা থেকে বাঁচতে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এসে বসতি স্থাপন করেছিল বলে পুলিশ সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ প্রশাসনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের আওতাধীন বাইশফাঁড়ি পাড়ায় বসবাসরত কিংহ্লা তঞ্চঙ্গ্যা ও তাঁর স্ত্রী আজ সকালে জুমচাষের উদ্দেশ্যে বের হন। কাজের সুবিধার্থে তাঁরা তাঁদের ১২ বছর বয়সী ছেলে সতনাইং তঞ্চঙ্গ্যাকেও সাথে নিয়ে যান।
বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের ৯ নম্বর পিলার থেকে আনুমানিক ১০০ গজ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে একটি জুমখেতে জুমঘর নির্মাণের কাজ করছিলেন কিংহ্লা তঞ্চঙ্গ্যা। ওই সময় তাঁর ছেলে সতনাইং মাঠ থেকে একটি পরিত্যক্ত মর্টারশেল কুড়িয়ে পায়। লোহার সদৃশ ওই ক্ষতিকারক বস্তুটিকে সাধারণ খেলনা মনে করে সেটি নিয়ে খেলা করার একপর্যায়ে হঠাৎ সেটির বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের তীব্রতায় কিশোরের শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
পরবর্তীতে আশেপাশের জুমচাষি ও স্থানীয় লোকজন ঘটনাস্থলে ছুটে এসে নিহতের লাশের বিভিন্ন অংশ উদ্ধার করে বাইশফাঁড়ি পাড়া এলাকায় নিয়ে আসেন। ঘটনার পরপরই স্থানীয় বাইশফাঁড়ি পুলিশ তদন্তকেন্দ্রে খবর দেওয়া হলে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থল ও নিহতের বাড়িতে গিয়ে লাশ নিজেদের হেফাজতে নেয়।
পুলিশের দাপ্তরিক তথ্যমতে, নিহত কিশোরের বাবা কিংহ্লা তঞ্চঙ্গ্যার স্থায়ী আদি নিবাস মিয়ানমারের মংডু টাউনশিপের ডেকিবুনিয়া থানার মেদাই গ্রামে। গত পাঁচ-ছয় বছর আগে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সরকারি বাহিনী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়লে জীবন বাঁচাতে এই পরিবারটি সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। প্রথমে তারা নাইক্ষ্যংছড়ির বাইশফাঁড়ি পাড়ায় এক আত্মীয়ের বাড়িতে এসে আশ্রয় নেয় এবং পরবর্তীতে ওই এলাকাতেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে।
ঘুমধুম ও নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত এলাকায় এটিই প্রথম বিস্ফোরণের ঘটনা নয়। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের জেরে বিভিন্ন সময়ে এপারে এসে পড়া মর্টারশেল ও সীমান্তজুড়ে পুঁতে রাখা স্থলমাইনের কারণে প্রায়শই সাধারণ মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। নিচে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া সীমান্ত দুর্ঘটনার একটি সংক্ষিপ্ত পরিসংখ্যান দেওয়া হলো:
| তারিখ | ঘটনার স্থান | দুর্ঘটনার ধরণ | হতাহতের বিবরণ |
| চলতি বছরের ২৪ মে | ভালুকিয়া এলাকা, ঘুমধুম সীমান্ত | স্থলমাইন বিস্ফোরণ | ৩ জন বাংলাদেশি বাগানচাষির মৃত্যু |
| সাম্প্রতিক সময় | ভালুকিয়াপাড়া, ঘুমধুম সীমান্ত | বাগানে কাজ করতে গিয়ে নিখোঁজ | ২ জন বাংলাদেশি এখনো নিখোঁজ |
| আজ (মঙ্গলবার) | বাইশফাঁড়ি এলাকা, ৯নং পিলার | পরিত্যক্ত মর্টারশেল বিস্ফোরণ | ১ জন কিশোরের (১২) মৃত্যু |
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, ভালুকিয়াপাড়ার যে দুই বাংলাদেশি নাগরিক বাগানে কাজ করতে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছিলেন, বর্তমান সময় পর্যন্ত তাঁদের কোনো সন্ধান বা হদিস মেলেনি। ফলে সীমান্ত অঞ্চলের বাসিন্দাদের মধ্যে এক ধরণের স্থায়ী আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে।
নাইক্ষ্যংছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোজাম্মেল হক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, পরিত্যক্ত মর্টারশেল বিস্ফোরণে নিহত কিশোরের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি শেষে লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করার জন্য জেলা সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হবে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং প্রাথমিক তদন্তের ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি জানান। একই সাথে সীমান্ত এলাকায় চলাচলের ক্ষেত্রে স্থানীয় ও সাধারণ জনগণকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে প্রশাসন।