রাজধানীর মিরপুর এলাকায় একটি মার্কেটের মালিকানা ও দখল নিয়ে সৃষ্ট বিরোধ মীমাংসার নামে অনৈতিকভাবে অর্থ গ্রহণের অভিযোগে মিরপুর মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ গোলাম আজমকে প্রশাসনিকভাবে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ডিএমপি কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) মো. সরওয়ার স্বাক্ষরিত এক দাপ্তরিক আদেশে তাঁকে মিরপুর মডেল থানা থেকে সরিয়ে ডিএমপি সদর দপ্তরের প্রশাসন বিভাগের কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ দপ্তরে (ক্লোজড) সংযুক্ত করা হয়।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও অর্থ লেনদেনের বিবরণ
গত ২৬ এপ্রিল সামসাদ আরা সাথী নামের একজন ভুক্তভোগী নারী ডিএমপি কমিশনারের কাছে মোহাম্মদ গোলাম আজমের বিরুদ্ধে একটি বিস্তারিত লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, তাঁর মালিকানাধীন মার্কেটের অবৈধ দখল উচ্ছেদে সহায়তার আশ্বাস দিয়ে ওসি তাঁর কাছে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করেছিলেন।
সামসাদ আরা সাথীর দাবি অনুযায়ী, ওসি তাঁর থানার দুজন উপ-পরিদর্শককে (এসআই) মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে দুই দফায় মোট পাঁচ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণ করেন। তবে অভিযোগকারীর ভাষ্যমতে, বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রদানের পরও পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর সহায়তা প্রদান করা হয়নি। বরং উচ্ছেদ অভিযানে সহায়তা না পাওয়ায় তিনি দখলদারদের হাতে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হয়েছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। ঘুষের টাকা নেওয়ার পরও ওসি আরও অতিরিক্ত অর্থ দাবি করে আসছিলেন বলে ভুক্তভোগী দাবি করেন।
ডিএমপির বক্তব্য ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ
শনিবার (২ মে) রাতে মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. মোস্তাক সরকার ওসির প্রত্যাহারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি সংবাদমাধ্যমকে জানান, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ওসি মোহাম্মদ গোলাম আজমকে ডিএমপি সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। তবে এই প্রত্যাহার ওই নারীর অভিযোগের সরাসরি ফলাফল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, তদন্ত প্রক্রিয়া সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।
ডিসি মোস্তাক সরকারের মতে, পুলিশের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক কারণে কর্মকর্তাদের বদলি বা প্রত্যাহার একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। বর্তমানে মিরপুর মডেল থানার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নতুন কোনো স্থায়ী কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়নি। সাময়িকভাবে অন্য কর্মকর্তাদের মাধ্যমে থানার দৈনন্দিন কার্যক্রম তদারকি করা হচ্ছে।
তদন্ত ও ভবিষ্যৎ আইনি কার্যক্রম
ডিএমপি কমিশনারের কাছে অভিযোগ দায়েরের মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় ওসির বিরুদ্ধে এই পদক্ষেপ নেওয়া হলো। ভুক্তভোগী সামসাদ আরা সাথী জানিয়েছেন, ওসির প্রত্যাহারের খবর তিনি বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পেরেছেন, তবে পুলিশের পক্ষ থেকে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্তের অগ্রগতি জানানো হয়নি।
পুলিশের ঊর্ধ্বতন সূত্রমতে, বাহিনীর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে পেশাগত অসদাচরণ বা আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। মোহাম্মদ গোলাম আজমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগটি বর্তমানে ডিএমপির ডিসিপ্লিনারি সেকশন খতিয়ে দেখছে। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি প্রচলিত আইনে মামলার সুপারিশও করা হতে পারে।
জননিরাপত্তা ও জবাবদিহিতার গুরুত্ব
মিরপুর মডেল থানার মতো গুরুত্বপূর্ণ জনপদে দায়িত্বরত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এ ধরনের গুরুতর অভিযোগ ওঠায় স্থানীয় জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। অপরাধ দমনে জনগণের আস্থা বজায় রাখতে ডিএমপি সদর দপ্তর থেকে কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে। জানানো হয়েছে, কোনো পুলিশ সদস্যের ব্যক্তিগত অপরাধের দায়ভার বাহিনী বহন করবে না। সাধারণ নাগরিকদের আইনি সেবা নিশ্চিত করতে এবং তদন্তকালীন সময়ে যেন কোনো প্রমাণ লোপাট না হয়, সেই উদ্দেশ্যেই এই তাৎক্ষণিক প্রত্যাহার কার্যকর করা হয়েছে। ডিএমপি সদর দপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল সাপেক্ষে অভিযুক্ত কর্মকর্তার পরবর্তী ভাগ্য নির্ধারিত হবে।



