আফতাব তাজ
প্রকাশ: শনিবার, ৫ জুলাই ২০২৫
চলচ্চিত্র নির্মাণে সরকারি অনুদান নিয়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক বিতর্ক। স্বচ্ছতার ঘাটতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তুলে ক্ষোভ জানিয়েছেন অনেক নির্মাতা ও চলচ্চিত্রকর্মী। কেউ কেউ বলছেন, অনুদানের নামে ‘নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগির উৎসব’ হয়েছে। অনুদান কমিটির তিন সদস্য পদত্যাগ করায় প্রশ্ন আরও ঘনীভূত হয়েছে।
এ বছর প্রজ্ঞাপনে নির্মাতা ও প্রযোজকদের নাম প্রকাশ না করায় অনেকে সন্দেহ করছেন, অনুদান পেয়েছেন কমিটির সদস্য বা তাঁদের ঘনিষ্ঠজনেরা। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, উপ-কমিটি ও স্ক্রিপ্ট মূল্যায়ন কমিটিতে থাকা কয়েকজন সদস্য সরাসরি বা পরোক্ষভাবে অনুদানের সুবিধাভোগী হয়েছেন।
এদের মধ্যে আছেন আবিদ মল্লিক, সাদিয়া খালিদ রীতি, আরিফুর রহমান, মুশফিকুর রহমান, লাবিব নাজমুস ছাকিব ও সাইদুল আলম খান। হুমায়রা বিলকিসের স্বামী মাহমুদুল ইসলামও অনুদান পেয়েছেন—যদিও হুমায়রার পূর্বের অনুদানপ্রাপ্ত ছবিটি এখনও মুক্তি পায়নি।
জাকিয়া বারী মম, তিতাস জিয়া ও সামির আহমেদ ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে অনুদান কমিটি থেকে পদত্যাগ করলেও পরে মম জানিয়েছেন, নির্বাচিত সিনেমার বিষয়ে তাঁর কোনো ভূমিকা ছিল না। অন্যদিকে, এক সদস্য বলেন, যেসব ভালো গল্প তারা সুপারিশ করেছিলেন, সেগুলোর অনেকটাই বাদ পড়েছে।
অনেক আবেদনকারী অভিযোগ করেছেন, মাত্র ২–৩ মিনিটে পিচিং শেষ করে দেওয়া হয়, ভালো গল্প দিয়েও তারা বাদ পড়েছেন, আর অনভিজ্ঞদের অনুদান দেওয়া হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটেছে। কেউ বলছেন, ফেরেশতা সেজে নিজেরাই টাকা ভাগ করে নিলেন, কেউ বলছেন—বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন, প্যানেলের ঘনিষ্ঠদেরই অনুদান দেওয়া হয়েছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য ১৩ কোটি টাকা বরাদ্দে ৩২টি সিনেমাকে অনুদান দেওয়া হচ্ছে। তবে যেভাবে এই অনুদান বিতরণ হয়েছে, তা চলচ্চিত্র জগতে এক গভীর হতাশা ও বিশ্বাসহীনতার জন্ম দিয়েছে।
অনুদানের জন্য আবেদন করেছেন, পাবেন বলে আশাবাদী ছিলেন এ রকম একজন আবেদনকারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অনুদান পাইনি বলে আমার কোনো ক্ষোভ নেই। আমার লবিং হয়তো অতটা স্ট্রং ছিল না। কিন্তু আমার দুঃখ, পিচিংয়ের প্রেজেন্টেশন খুলতে না খুলতেই পিচিং শেষ হয়ে গিয়েছিল! অথচ আমার গল্পটা নাকি অনেকেরই পছন্দ হয়েছিল!’
অনুদান প্রত্যাশী আরেক পরিচালক বলেন, ‘আমি ছোট মানুষ। অনেক বড় বড় পরিচালককে সারাদিন বসিয়ে রেখে যা করা হয়েছে, তা বলার মতো নয়! যারা অনুদান পেয়েছে, তাদের অনেকে আছেন যারা কোনোদিন কোনো কিছুই বানাননি। কীভাবে তাদের অনুদান দেওয়া হলো সেটা সাবার সামনে প্রকাশ করতে হবে।’
চলচ্চিত্র পরিচালক আশরাফ শিশির লিখেছেন, ‘একদল ফেরেশতা এইবার চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কমিটিতে ছিল। অতঃপর আগের রেজিমকে গালি দিয়ে নিজেরাই নিজেদের ভেতর অনুদান ভাগ করে নিল। কয়েক কোটি টাকা!’
কবি শিমুল সালাহউদ্দিন লিখেছেন, ‘অনুদান পাওয়া মাহমুদুল ইসলাম বিগত দিনে অনুদান পাওয়া নির্মাতা হুমায়রা বিলকিসের স্বামী। হুমায়রা বিলকিস আবার অনুদান কমিটিতে থাকা পরিচালক আকরাম খানের ছোটবোন নাফিসার বান্ধবী। অমুকের ছোটভাই, তমুকের বান্ধবী, অমুকের প্যানেলে কাজ করে এমন বিবেচনায় দেওয়া হয়েছে তবে এবারের অনুদান? অনুদান পাওয়া গোলাম সোহরাব দোদুল ইউনূস সাহেবের কী হন সেটা আমি আর নাই বা বলি! তো নিজেরাই যদি নিয়ে নেন সব, দেবেন কাকে!’
দেখা গেছে, অনুদান পাওয়া মো. আবিদ মল্লিক আছেন চলচ্চিত্র অনুদান উপ-কমিটির সদস্য হিসেবে। অনুদান পাওয়া চলচ্চিত্র সাংবাদিক ও সমালোচক সাদিয়া খালিদ রীতি চলচ্চিত্রবিষয়ক জাতীয় পরামর্শক কমিটি এবং চলচ্চিত্র অনুদান স্ক্রিপ্ট বাছাই কমিটির সদস্য। চলচ্চিত্রবিষয়ক জাতীয় পরামর্শক কমিটির সদস্য মো. আরিফুর রহমান ও মুশফিকুর রহমানও পেয়েছেন অনুদান। লাবিব নাজমুস ছাকিব ফিল্ম আর্কাইভ বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্য, মোহাম্মদ সাইদুল আলম খান তথ্য মন্ত্রণালয় সংস্কারের সার্চ কমিটির সদস্য।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩২টি সিনেমাকে দেওয়া হবে মোট ১৩ কোটি টাকা অনুদান। অনুদান কমিটির সদস্যরা হলেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষক ও অভিনেতা-নির্দেশক ড. আবুল বাশার মো. জিয়াউল হক (তিতাস জিয়া), চলচ্চিত্র নির্মাতা ও প্রযোজক খান শারফুদ্দীন মোহাম্মদ আকরাম (আকরাম খান), চলচ্চিত্র নির্মাতা ও চিত্রনাট্যকার নার্গিস আখতার, রেইনবো চলচ্চিত্র সংসদের সভাপতি আহমেদ মুজতবা জামাল, নির্মাতা ও সম্পাদক সামির আহমেদ, অভিনেত্রী জাকিয়া বারী মম।
খবরওয়ালা/এমএজেড