খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
সিলেটের পাহাড়ি পথে শান্তি নেমেছিল ঠিক তখনই, যখন দেশের ক্রীড়াঙ্গন একে একে তার প্রাণপ্রবাহ হারাচ্ছিল। ফুটবল ও হকি মাঠের অমর নায়ক, ৯৩ বছর বয়সী কিংবদন্তি গোলকিপার রণজিৎ দাস গতকাল ভোরে চিরতরে নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। সকাল ৬টা ৫৫ মিনিটে সিলেটের একটি হাসপাতালে শেষ বিদায় নেন তিনি।
রণজিৎ দাস ছিলেন এক ‘মাল্টি-ট্যালেন্টেড’ ক্রীড়াবিদ, যিনি ১৯৫০-এর দশকে ঢাকার মাঠ মাতিয়েছেন। ১৯৩২ সালের ২৯ অক্টোবর সিলেটে জন্মগ্রহণকারী রণজিৎ দাস ফুটবল ও হকির প্রতিটি শ্বাসেই জীবনের ছন্দ খুঁজে পেয়েছিলেন। পঞ্চাশের দশকে ইস্পাহানি ক্লাব দিয়ে তার ফুটবল যাত্রা শুরু হয়, এরপর আজাদ স্পোর্টিং ক্লাবের অধিনায়কত্বে ১৯৫৮ সালে লিগ শিরোপা জিতেছিলেন।
| বছর | ক্লাব / দল | অবদান / পরিচিতি |
|---|---|---|
| ১৯৫৫ | ইস্পাহানি ক্লাব | ফুটবল যাত্রা শুরু |
| ১৯৫৭ | কলকাতা মোহামেডান | অল ইন্ডিয়া ডুরান্ড কাপ খেলেছেন |
| ১৯৫৮ | আজাদ স্পোর্টিং | লিগ শিরোপা জয় (অধিনায়কত্বে) |
| ১৯৬০-এর দশক | পূর্ব পাকিস্তান হকি দল | হকি দলের অধিনায়ক ও খেলোয়াড় |
| ২০০৬ | জাতীয় স্বীকৃতি | প্রথম আলো ক্রীড়া পুরস্কার (আজীবন সম্মাননা) |
| ২০০৭ | জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার | দেশের সর্বোচ্চ ক্রীড়া স্বীকৃতি |
রণজিৎ দাস শুধু ফুটবলেই নয়, হকিতেও ছিলেন অনন্য। ষাটের দশকে তিনি পূর্ব পাকিস্তান হকি দলের গোলপোস্ট রক্ষা করেছেন নিষ্ঠার সঙ্গে। একই সময়ে তিনি ফুটবলের পূর্ব পাকিস্তান দলেও অবদান রেখেছিলেন। তবে উচ্চতার সীমাবদ্ধতার কারণে পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলে সুযোগ না পাওয়ায় তাঁর মনে আজীবন একটি ক্ষত ছিল। এক সাক্ষাৎকারে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেছিলেন, “উচ্চতা কম ছিল বলেই হয়তো সুযোগ হয়নি।”
ক্রীড়াঙ্গনে তার অবদান শুধুই খেলোয়াড় হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ফুটবল ছাড়ার পর আজাদ স্পোর্টিং ক্লাবকে কোচিং করিয়েছেন, নতুন প্রজন্মকে ফুটবল ও হকিতে দীক্ষা দিয়েছেন। ২০০৬ সালে প্রথম আলো ক্রীড়া পুরস্কার ও ২০০৭ সালে জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারের মাধ্যমে তার অবদান স্বীকৃত হয়।
শেষ জীবনে স্ত্রী রেখা দাস ছিলেন তাঁর একমাত্র অবলম্বন। যে মানুষটি এক সময় মাঠে অনর্গল গল্প শোনাতেন এবং নিজেকে বলতেন ‘টেলিগ্রাম যুগের মানুষ’, শেষ জীবনে নির্বাক হয়ে বসে ছিলেন। দেশের ক্রীড়াঙ্গনের বহু মহীরুহের মতো, রণজিৎ দাসও চলে গেলেন চিরনিদ্রায়, রেখে গেলেন বীরত্বগাথার অমলিন স্মৃতি।
সিলেটের সেই পাহাড়ি রাস্তার ঢালে এখন আর কেউ ফুটবল-হকির গল্প শোনার জন্য দাঁড়িয়ে থাকবে না। তবে তাঁর অমর কীর্তি, অধিনায়কত্ব এবং ক্রীড়া জীবনের অবদান বাংলাদেশের খেলাধুলার ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।