খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ১৪ জুন ২০২৫
আজ তাঁর জন্মদিন—আর ইতিহাসে লেখা রইল এক বিপ্লবীর জীবনের শেষহীন অধ্যায়
আর্নেস্তো “চে” গুয়েভারা—এই নামটি শুধু একজন মানুষের নয়, বরং এক আন্দোলনের, এক স্বপ্নের, এক বজ্রনিনাদ প্রতিবাদের নাম।
আজ তাঁর জন্মদিন। পৃথিবীর ক্যালেন্ডারে যুক্ত হয় আরেকটি দিন, অথচ সময় যেন থমকে দাঁড়ায় তাঁর রেখে যাওয়া শিখার সামনে।
চে যেন জন্মেছিলেন কেবল বিপ্লবের জন্যই।
চিকিৎসকের সাদা অ্যাপ্রোন ছেড়ে হাতে তুলে নিয়েছিলেন বন্দুক। শুধু নয়—সমগ্র লাতিন আমেরিকার নিপীড়িত জনতার হাহাকার।
তিনি ছিলেন এক যাযাবর আদর্শ, এক দুর্বার অভিযাত্রী।
কিউবার সিয়েরা মায়েস্ত্রার পাহাড় থেকে বলিভিয়ার অরণ্য—চে ছুটেছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে, মানুষের মুক্তির বারতা হাতে।
রোমাঞ্চ আর রক্তের গল্প: এক বিপ্লবীর জীবন
১৯৬৭ সালের ৯ অক্টোবর, বলিভিয়ার লা হিগুয়েরার ছোট্ট স্কুলঘরটি সাক্ষী হয়েছিল ইতিহাসের—
মাত্র ৩৯ বছর বয়সে, সিআইএ-র সহায়তায় বলিভিয়ান সেনাদের হাতে বন্দি হন চে, এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই গুলি করে হত্যা করা হয়।
তাঁর মৃত্যুর খবর প্রথমে অনেকেই বিশ্বাস করেননি।
কারণ, তাঁর চারপাশে আগেও ঘুরেছে মৃত্যু ও গুজবের ধোঁয়া।
যেন তিনি বাস্তবের চেয়ে বড় এক কিংবদন্তি হয়ে উঠেছিলেন।
তাঁর দেহ ফেলে রাখা হয় একটি গোপন গণকবরে।
দুটি হাত কেটে রাখা হয় ফর্মালডিহাইডে—
যেন তাঁর সমাধি না হয় কোনও বিপ্লবের তীর্থস্থান।
কিন্তু চে থেমে যাওয়ার মানুষ নন।
১৯৯৭ সালে সেই হারিয়ে যাওয়া দেহাবশেষ উদ্ধার হয়।
কিউবার সান্তা ক্লারায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর সমাহিত হওয়ার মধ্য দিয়ে
চে যেন নতুন করে জন্ম নেন—প্রতিটি প্রতিবাদী কণ্ঠে, প্রতিটি সাহসী চোখে।
এক মুখ, এক আগুন: বিপ্লব থেকে ব্র্যান্ডে রূপান্তর
চে গুয়েভারার জীবন ছিল রাজনীতি, ছিল আদর্শ, ছিল ত্যাগ।
কিন্তু সময়ের চাকার ঘূর্ণনে তিনি হয়ে উঠেছেন একটি শিল্প, একটি আবেগ, এমনকি একটি ব্র্যান্ড।
হাভানায় ১৯৬০ সালের এক শোকসভায় আলবার্তো কোরদার ক্যামেরায় বন্দি সেই বিখ্যাত মুখ—
যা পৃথিবীর ইতিহাসে “সবচেয়ে পুনরুৎপাদিত ফটোগ্রাফ” হয়ে ওঠে।
কপিরাইটহীন সেই ছবি আজ ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বজুড়ে—
টি-শার্টে, ব্যাগে, মোবাইল কভারে, দেয়ালে…
তবু অনেকেই জানেন না, তিনি কে ছিলেন।
কেউ তাঁকে পড়েন, কেউ বোঝেন, আর অনেকেই শুধু পরেন।
চে হয়তো ফিরে তাকিয়ে বলতেন, “এ আমার বিপ্লব ছিল না।”
২০০০ সালে স্মিরনফ ভদকার বিজ্ঞাপনে তাঁর ছবি ব্যবহৃত হলে
কোরদা লন্ডনে মামলা করেন—
কারণ চে কখনো মদ্যপান করতেন না।
আর বিপ্লবীর মুখ বিক্রি হচ্ছিল এক পণ্যের মোড়কে।
চিরন্তন দ্বন্দ্ব: আদর্শ বনাম বিপণন
ফিদেল কাস্ত্রো বলেছিলেন, “চে ছিলেন সেই বিপ্লবী, যিনি যেকোনো জায়গায় প্রতিরক্ষার জন্য সদা প্রস্তুত।”
কিন্তু আধুনিক বিশ্বে তাঁকেই ব্যবহার করা হয় মার্কেটিংয়ের সেরা পোস্টার হিসেবে।
চে-র মুখ, যার ভাষ্য ছিল পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে,
আজ পুঁজিবাদেরই সবচেয়ে বিক্রিত চেহারা।
তবু এই দ্বৈততা, এই অসঙ্গতি তাঁকে আরও প্রাসঙ্গিক করে তোলে।
একদিকে স্বপ্নের বিপ্লব, অন্যদিকে ঝলমলে লোগো—
আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে মানুষটি, যিনি মৃত্যুর পরেও মরেননি।
জীবনের শেষে এক দীর্ঘ প্রত্যাবর্তন
তিন দশক পর, জন লি অ্যান্ডারসনের অনুসন্ধানে উঠে আসে সেই গণকবর।
সান্তা ক্লারায় রাষ্ট্রীয় সম্মানে সমাহিত হন চে।
ফিদেল বলেন,“চে আজও বেঁচে আছেন আমাদের প্রতিটি শিরায়।”
এক প্রবীণ বিপ্লবীর বিস্মিত স্বরে শোনা যায়, “সে তো আজও বেঁচে আছে, অথচ আমরা মরে যাচ্ছি চিন্তার ভারে।”
শেষের আগে একটি প্রশ্ন
প্রায় ছয় দশক পেরিয়ে গেছে—
তবু চে গুয়েভারার মৃত্যু নিয়ে সন্দেহ করা যায়,
কারণ তিনি ছিলেন শুধু শরীর নয়, এক দর্শন।
আজও প্রতিটি তরুণ বুকের ভেতর আগুন জ্বালাতে চায়
চে-র চোখে চোখ রেখে।
তাঁর মুখ হয়ে উঠেছে আয়না—
যেখানে আপনি দেখতে পারেন, আপনি কোন আদর্শে দাঁড়িয়ে আছেন।
প্রশ্নটা আজও ঘুরে ফিরে আসে
আপনি কোন চে-কে আগলে রাখবেন?
স্বপ্ন দেখা সেই বিপ্লবীকে,
নাকি শপিংমলের কাচে বাঁধা ফ্যাশন-লোগোকে?
জন্মদিনে চে-কে জানাই লাল সালাম।
তিনি ছিলেন, তিনি আছেন, তিনি থাকবেন—
যতদিন মানুষের বুকে প্রতিবাদ বাঁচে।
জন্মদিনের এই ক্ষণে শ্রদ্ধার্ঘ্য হে মহাবিপ্লবী।
লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক খবরওয়ালা