খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ৯ নভেম্বর ২০২৫
ত্যাগ ছিল তাঁর জীবনের ব্রত, দেশপ্রেম ছিল রক্তে মিশে থাকা এক অদম্য শক্তি।
তিনি শুধু দিয়েছেন—নিজেকে, সময়কে, সাধনাকে—কিন্তু কোনোদিন কিছু চাননি,
চাননি প্রতিদানও।
শহীদ আহসানউল্লাহ মাস্টার ছিলেন এক সত্যিকারের জনমানুষের শিক্ষক—
একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, একজন মানবিক নেতা, একজন অসাধারণ সংগঠক।
মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখযোদ্ধা
স্বাধীনতা সংগ্রামে তিনি ছিলেন সম্মুখযোদ্ধা—
যুদ্ধক্ষেত্রে জীবন বাজি রেখে নেতৃত্ব দিয়েছেন সহযোদ্ধাদের।
একবার পাকিস্তানি হানাদাররা তাঁকে ও তাঁর দলকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে।
তখনও তিনি ভয় পাননি।
শরীরের কাপড় খুলে হাতে স্টেনগান নিয়ে খালে ঝাঁপ দিয়ে
শত্রুপক্ষের ওপর পাল্টা আক্রমণ চালান।
হানাদাররা পিছু হটতে বাধ্য হয় তাঁর নেতৃত্বে।
আরেক যুদ্ধে শত্রুর বেয়নেট চার্জে আহত হলেও তিনি হার মানেননি—
ডান হাত দিয়ে বেয়নেট সরিয়ে আবার লড়াইয়ে ফেরেন।
দাঙ্গাবাজার, টিএসসি ও ছয়দানা—সবখানেই তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন সশস্ত্রযুদ্ধে।
কাশিমপুর থেকে সূচিত সেই যুদ্ধ শেষে
মিত্রবাহিনীর সঙ্গে মিলিত হয়ে শত্রুপক্ষকে পরাজিত করেন।
এভাবেই প্রতিটি যুদ্ধে তিনি দলকে দিয়েছেন সাহস,
নিজে ছিলেন অগ্রভাগে—এক অকুতোভয় সৈনিকের প্রতিচ্ছবি হয়ে।
শিক্ষা ও রাজনীতির মিলনধারা
আহসানউল্লাহ মাস্টার ছিলেন শিক্ষা ও রাজনীতির এক অনন্য যোগসূত্র।
তিনি বিশ্বাস করতেন—
“শিক্ষা মানুষকে মুক্ত করে, আর মুক্ত মানুষই গড়ে তোলে মুক্ত দেশ।”
১৯৭০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর
তিনি শিক্ষকতা পেশা বেছে নেন।
শিক্ষক হিসেবে তিনি ছিলেন অনুপ্রেরণার উৎস—
ছাত্রদের মনে স্বাধীনতার চেতনা, মানবিকতা ও দেশপ্রেম জাগিয়ে তুলতেন নিপুণ শিল্পীর মতো।
তিনি ছিলেন শিক্ষকদের শিক্ষক,
রাজনীতির শিক্ষক,
আর রাজনীতিবিদদের শিক্ষকও।
রাজনীতির মাঠে মানুষের নেতা
১৯৮৩ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত তিনি পুবাইল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন—
অতুলনীয় জনপ্রিয়তার সাক্ষ্য রেখে পরপর নির্বাচিত হন তিনি।
পরে ১৯৯০ সালে গাজীপুর সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
১৯৯৬ সালে তিনি গাজীপুর-২ আসন থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
২০০১ সালেও, প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও নানা অপকৌশল সত্ত্বেও,
তিনি আবারও জনগণের ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন—
জনমানুষের হৃদয়ে তাঁর অবস্থান ছিল অটল, অদম্য।
শ্রমিকদের অধিকার আন্দোলনে
শ্রমজীবী মানুষের প্রতি তাঁর মমতা ছিল অপরিসীম।
তিনি ছিলেন জাতীয় শ্রমিক লীগের কার্যকরী সভাপতি,
এর আগে দায়িত্ব পালন করেছেন সাধারণ সম্পাদক হিসেবে।
তাছাড়া তিনি ছিলেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস)-এর চেয়ারম্যান।
শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার,
চুক্তি বাস্তবায়ন, পেশাগত নিরাপত্তা,
প্রবাসী শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা—
এসব বিষয়ে তিনি আজীবন লড়াই করেছেন।
শ্রমিকদের আইনি সহায়তার জন্য নিজে তহবিল গঠন করেন,
সংগঠনের প্রতিটি আন্দোলনে ছিলেন সামনের সারিতে।
বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত
জাপানের এক সফরে শ্রমিক নেতারা তাঁকে উপহার দিতে চাইলে
তিনি বিনয়ের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন—
“আপনারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি ছবি আপনার জাদুঘরে রাখুন।”
আজও সেই ছবি জাপানের জাদুঘরে শোভিত—
যা প্রমাণ করে তাঁর আত্মিক শ্রদ্ধা,
আর জাতির জনকের প্রতি অগাধ ভালোবাসা।
চিরঅমর স্মৃতি
মুক্তিযুদ্ধের ময়দানে যেমন ছিলেন সম্মুখযোদ্ধা,
তেমনি গণতন্ত্রের লড়াইটেও ছিলেন নির্ভীক যোদ্ধা।
খুনিরা হত্যা করেছে আহসানউল্লাহ মাস্টারকে,
কিন্তু তারা হত্যা করতে পারেনি
স্বাধীনতার চেতনায় বিশ্বাসী একজন নেতাকে।
জন্ম: ৯ নভেম্বর ১৯৫০
শহীদত্ব: ৭ মে ২০০৪
তাঁর জীবন এক আলোকবর্তিকা—
যেখানে ত্যাগ, আদর্শ, দেশপ্রেম ও মানবিকতা
আজও প্রজন্মকে পথ দেখায়।