ভারতের গুজরাট রাজ্যে অবস্থিত গুজরাট ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স টেক-সিটি (জিআইএফটি সিটি) ধীরে ধীরে একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক পুনর্বীমা কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। ভারত সরকার দীর্ঘদিন ধরে যে লক্ষ্য নিয়ে এই বিশেষ আর্থিক অঞ্চলকে বৈশ্বিক মানের আর্থিক সেবা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তার বাস্তব প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে পুনর্বীমা খাতে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রমবর্ধমান আগ্রহ জিআইএফটি সিটির সম্ভাবনাকে আরও দৃঢ় করেছে।
শিল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, বিশ্বের একাধিক সুপরিচিত পুনর্বীমা প্রতিষ্ঠান বর্তমানে জিআইএফটি সিটিতে কার্যক্রম শুরুর বিষয়ে সম্ভাব্যতা যাচাই করছে। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাজ্যের ঐতিহ্যবাহী লয়েডস অব লন্ডন, দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং রে, আফ্রিকার কেনিয়া রে এবং স্পেনভিত্তিক ম্যাপফ্রে রে। প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক অনুমোদন পেলে এসব প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে কার্যক্রম পরিচালনাকারী ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এক ডজনের বেশি আন্তর্জাতিক পুনর্বীমা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন। বিশ্লেষকদের মতে, চলতি ও আগামী বছরে একাধিক আবেদন অনুমোদিত হলে জিআইএফটি সিটি দ্রুত একটি ঘনবদ্ধ পুনর্বীমা ক্লাস্টারে পরিণত হবে।
জিআইএফটি সিটির অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো এর প্রতিযোগিতামূলক কর ও নীতিগত সুবিধা। নতুনভাবে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলো সর্বোচ্চ দশ বছর পর্যন্ত করপোরেট আয়কর অবকাশ পায়। পাশাপাশি মূলধন মুনাফা কর, লেনদেনভিত্তিক কিছু কর এবং নির্দিষ্ট শর্তে লভ্যাংশ কর থেকেও ছাড় দেওয়া হয়। এই সুবিধাগুলো আন্তর্জাতিক পুনর্বীমা কোম্পানিগুলোর পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনে এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে উৎসাহ জোগায়। নীতিনির্ধারকদের মতে, এর ফলে ভারতের অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি ধারণক্ষমতা বাড়বে এবং বিদেশি পুনর্বীমা বাজারের ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে হ্রাস পাবে।
নিয়ন্ত্রক কাঠামোর ক্ষেত্রেও জিআইএফটি সিটি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস সেন্টার্স অথরিটি (আইএফএসসিএ) একক জানালা ব্যবস্থার মাধ্যমে লাইসেন্স প্রদান, তদারকি ও সম্মতি কার্যক্রম পরিচালনা করে। এতে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রশাসনিক জটিলতা ও সময় ব্যয় কমে যায়। আধুনিক অবকাঠামো, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারে শিথিল নীতি এবং সহজীকৃত সীমান্ত-পার লেনদেন ব্যবস্থা পুনর্বীমা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মতো জটিল আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনায় সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।
ঐতিহাসিকভাবে ভারতের পুনর্বীমা বাজারে সীমিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য ছিল, যেমন সুইস রে, মিউনিখ রে এবং রাষ্ট্রায়ত্ত জেনারেল ইন্স্যুরেন্স করপোরেশন অব ইন্ডিয়া (জিআইসি রে)। তবে স্বাস্থ্য, কৃষি, অবকাঠামো ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিমার পরিসর সম্প্রসারণে সরকারি উদ্যোগ ভবিষ্যতে পুনর্বীমার চাহিদা বহুগুণ বাড়াবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। এর ফলে আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণ আরও জোরদার হবে এবং বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পেলে প্রিমিয়াম নির্ধারণ আরও দক্ষ হবে, আধুনিক অ্যাকচুয়ারিয়াল বিশ্লেষণ ও ঝুঁকি মডেলিং পদ্ধতির ব্যবহার বাড়বে এবং সামগ্রিকভাবে পুনর্বীমা বাজার আরও স্থিতিশীল ও স্বচ্ছ হবে। সব মিলিয়ে জিআইএফটি সিটি ধীরে ধীরে এশিয়ার একটি বিশ্বাসযোগ্য ও প্রতিযোগিতামূলক পুনর্বীমা কেন্দ্র হিসেবে নিজ অবস্থান সুদৃঢ় করছে।
জিআইএফটি সিটিতে নির্বাচিত পুনর্বীমা প্রতিষ্ঠানসমূহ
| পুনর্বীমা কোম্পানি | দেশ | জিআইএফটি সিটিতে অবস্থা |
|---|---|---|
| সুইস রে | সুইজারল্যান্ড | কার্যক্রম চালু |
| মিউনিখ রে | জার্মানি | কার্যক্রম চালু |
| জিআইসি রে | ভারত | কার্যক্রম চালু |
| লয়েডস অব লন্ডন | যুক্তরাজ্য | প্রস্তাবিত |
| স্যামসাং রে | দক্ষিণ কোরিয়া | প্রস্তাবিত |
| কেনিয়া রে | কেনিয়া | প্রস্তাবিত |
| ম্যাপফ্রে রে | স্পেন | প্রস্তাবিত |
সার্বিকভাবে ধারাবাহিক নীতিগত সহায়তা, আধুনিক অবকাঠামো ও আন্তর্জাতিক আগ্রহ বজায় থাকলে জিআইএফটি সিটি ভারতের আর্থিক স্থিতিশীলতা জোরদার এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে একটি গুরুত্বপূর্ণ পুনর্বীমা কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।