খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ৩০ জুন ২০২৫
ফেব্রুয়ারির এক বিকেল। কক্সবাজার রেলস্টেশনের পাশে ছোট্ট একটি বইয়ের দোকান, তার পাশেই চায়ের দোকান আর গাছতলায় কয়েকটি কংক্রিটের বেঞ্চ। সেখানেই কয়েকজন তরুণ-তরুণীর আড্ডা। ঢাকা থেকে দুদিনের কাজে গিয়েছিলাম—চায়ের সন্ধানে হাঁটতে হাঁটতে এই আড্ডাস্থলের সন্ধান মেলে। চা হাতে তাদের পাশে বসতেই জায়গা করে দিলো ভদ্রভাবে। আলাপচারিতায় জানা গেলো, বেশিরভাগই বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় কাজ করতেন, তবে এখন সবাই বেকার। ইউএসএআইডি তাদের বেশিরভাগ প্রকল্পে অর্থায়ন বন্ধ করায় চাকরি হারিয়েছেন তাঁরা।
২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি, মার্কিন ট্রাম্প প্রশাসনের জারি করা স্টপ-ওয়ার্ক-অর্ডারের ফলে বাংলাদেশে ইউএসএআইডি পরিচালিত ৫৯টি প্রকল্পের মধ্যে ৫৫টি বন্ধ হয়ে যায়। এতে বন্ধ হয়ে যায় প্রায় সাড়ে আট হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন কার্যক্রম। কক্সবাজারের মতো এলাকায় যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে—বিশেষত যারা অন্য জেলা থেকে এসে এসব প্রকল্পে কাজ করছিলেন।
সম্প্রতি ‘অ্যাসোসিয়েশন অব আনএমপ্লয়েড ডেভেলপমেন্ট প্রফেশনালস (অডিপ)’ জানিয়েছে, এসব প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে অন্তত ৫০ হাজার কর্মী বেকার হয়েছেন। কিন্তু এই সংকট কেবল কক্সবাজার বা এনজিও খাতেই সীমাবদ্ধ নয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত এক গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) দেশজুড়ে চাকরি হারিয়েছেন প্রায় ২১ লাখ মানুষ। ২১ লাখ মানুষের চাকরি হারানো মানে ২১ লাখ সংসারে অনিশ্চয়তা। এর মধ্যে ৮৫ শতাংশ—অর্থাৎ প্রায় ১৮ লাখই নারী। বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে একসঙ্গে এত বিশালসংখ্যক মানুষের কর্মহীন হয়ে পড়ার নজির নেই।
অর্থনীতিবিদ তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, “এই জরিপ হলো দেশের শ্রমবাজারের প্রকৃত অবস্থার প্রতিনিধিত্বকারী। বাংলাদেশ একটি শ্রমঘন অর্থনীতি হওয়ায় কর্মসংস্থান এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইন্ডিকেটর।”
তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, জরিপে কোনো নির্দিষ্ট সেক্টরের তথ্য নেই—বলা হয়নি কৃষি, শিল্প নাকি সেবা খাত থেকে চাকরি হারিয়েছে এই মানুষগুলো। সরকারের সদ্য ঘোষিত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটেও এই বিপুল চাকরি হারানোর তথ্য উপেক্ষিত থেকে গেছে। অর্থ উপদেষ্টার তিনটি ‘শূন্যের লক্ষ্য’র একটি হচ্ছে “বেকারত্ব শূন্যে নামানো”, অথচ তার বাজেটে এই ভয়াবহ বাস্তবতার প্রতিফলন নেই।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছেন নারী শ্রমজীবীরা। তৌফিকুল খান বলেন, “বেশিরভাগ নারী কাজ করতেন অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে—যেখানে চাকরির নিরাপত্তা খুব কম। রাজনৈতিক অস্থিরতা, শিল্প-কারখানায় অচলাবস্থা, ও সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক শ্লথতার ফলে এসব খাতেই কাজ হারানো বেশি হয়েছে বলে ধারণা করা যায়।”
নারী শ্রমিকদের শ্রম বাজারে অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, “যেকোনো সংকটে প্রথমে ক্ষতিগ্রস্ত হন নারী কর্মীরা। কারণ তাদের নেই ট্রেড ইউনিয়নের শক্তি বা আত্মপক্ষ রক্ষার কাঠামো। তাদের চাকরি চলে গেলে প্রতিষ্ঠানগুলোর খরচ কমে যায়, ফলে তারা সহজ টার্গেট।”
তিনি আরও বলেন, “অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সময় নারীরা এমনসব স্বনিয়োজিত পেশায় যান যেখানে মজুরি নেই, লাভের হিসেব নেই, এমনকি নিজের শ্রমেরও মূল্য দেন না। এটি একধরনের আত্মশোষণ।” দেবপ্রিয় মনে করেন, এসব নারীদের জন্য রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সামাজিক সুরক্ষা ও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা না থাকলে, দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশ নারীর ক্ষমতায়নে পিছিয়ে পড়বে।
চম্পা নামের এক পোশাক শ্রমিক গত ডিসেম্বরে ধামরাইয়ের একটি গার্মেন্ট থেকে চাকরি হারিয়েছেন হঠাৎ করেই। তার স্বামীর সঙ্গে যৌথ আয়েই চলছিল দুই সন্তানের পড়াশোনা ও সংসার। কিন্তু এখন স্কুলের বেতন দিতে না পারায় সন্তানদের পড়াশোনাও থমকে গেছে।
মানিকগঞ্জের শিল্পীও একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি। আট বছরের অভিজ্ঞতা থাকার পরেও শুধু মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার কারণেই চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় তাকে। এমনকি পোশাক শ্রমিকদের ডেটাবেইজে তার নাম উঠিয়ে দেওয়া হয়, যাতে অন্য কোথাও চাকরি না পান।
এই বাস্তবতা বুঝিয়ে দেয়, শুধুমাত্র চাকরি হারানো নয় তাদের ভবিষ্যৎ কাজের সম্ভাবনাও সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, “আমরা অনেক সময় প্রবৃদ্ধির হার বাড়া, রপ্তানি বাড়া দেখে খুশি হই। কিন্তু এর পেছনে কর্মসংস্থান বাড়ছে কি না, জীবনমান উন্নত হচ্ছে কি না, সেটা দেখা জরুরি।”
তিনি মনে করেন, কর্মসংস্থান না থাকলে দারিদ্র্য বাড়ে, পুষ্টিহীনতা ও শিক্ষা ঝুঁকির মুখে পড়ে। বিশেষ করে নারী ও তরুণদের মধ্যে হতাশা বাড়ে। একটি শ্রমঘন দেশের জন্য এই বাস্তবতা ভয়াবহ। অথচ সরকারের বাজেট বক্তৃতা বা অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় এই সংকটের কোনো উল্লেখই নেই।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, “নারী কর্মসংস্থান, নারীর নিরাপত্তা, ডে-কেয়ার সুবিধা- এসব বিষয়কে আগামী নির্বাচনের ইশতেহার ও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে। তা না হলে শুধু অর্থনীতিই নয়, সামাজিক কাঠামোতেও দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি হবে।”
যাদের দিয়ে এই গল্প শুরু, কক্সবাজারের সেই তরুণ-তরুণীরা। তাদের একজন জানালেন, গত মাসে একটি নতুন চাকরি পেয়েছেন তিনি। তবে আগের তুলনায় বেতন ও পদমর্যাদায় অবনমন মেনে নিয়েই চাকরিতে যোগ দিতে হয়েছে।
এটাই এখন দেশের বাস্তবতা- চাকরি আছে, তবে পছন্দসই নয়। আর অনেকের জন্য তো তাও নেই।
সূত্র: ডয়েচে ভেলে
খবরওয়ালা/এমএজেড