খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 19শে ফাল্গুন ১৪৩২ | ৩ই মার্চ ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে একপ্রকার অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। একদিকে অপরিশোধিত তেল ও গ্যাসের দাম বাড়ছে, অন্যদিকে সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। এই প্রভাব বাংলাদেশেও স্পষ্টভাবে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, মূল্যবৃদ্ধি স্থায়ী হলে এবং সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে দেশের জ্বালানি বাজারে ঘাটতি ও মূল্যবৃদ্ধি দেখা দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর ইরান প্রতিহিংসামূলক ব্যবস্থা হিসেবে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলে কঠোর সতর্কতা জারি করেছে। একই সঙ্গে কাতার তাদের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন ও রপ্তানি বন্ধ করেছে। সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো তাদের প্রধান শোধনাগার রাস তানুরা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ফলে অপরিশোধিত তেলের দাম ইতিমধ্যে প্রায় ৮০ ডলারে পৌঁছেছে, যা গত সপ্তাহের তুলনায় ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এলএনজির দাম বিশ্ববাজারে ২০-২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কিন ডলারের শক্তিশালী অবস্থার কারণে জ্বালানি আমদানির খরচও বেড়ে গেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের ওপরও চলে যেতে পারে।
বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের প্রায় ১০০ শতাংশ আমদানিনির্ভর। এর মধ্যে অপরিশোধিত তেলের পুরো পরিমাণ আসে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। পরিশোধিত তেল আসে চীন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে। দেশের গ্যাস চাহিদার ৩৫ শতাংশ পূরণ হয় বিদেশ থেকে আনা এলএনজি দিয়ে। হরমুজ প্রণালিতে চলাচলে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হওয়ায় এসব আমদানির ওপর সরাসরি প্রভাব পড়ছে।
| তেল প্রকার | মজুত (টন) | সরবরাহকাল (দিন) |
|---|---|---|
| ডিজেল | ২,১৭,৩১৭ | ১৪–১৫ |
| পেট্রোল | ২১,৭০৫ | ১৭ |
| অকটেন | ৩৪,১৩৩ | ৩১ |
| ফার্নেস তেল | ৭৮,২৭৮ | ৬০ |
বিপিসি সূত্র জানায়, রাস তানুরা থেকে ১ থেকে ৩ মার্চের মধ্যে এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল জাহাজে তোলা হওয়ার কথা ছিল। শোধনাগার বন্ধ থাকায় এটি অনিশ্চিত। হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা ও সামরিক নজরদারি বেড়ে যাওয়ায় জাহাজের যাত্রা বিলম্বিত হতে পারে, যার ফলে তেল দেশে পৌঁছাতে সময় বেশি লাগতে পারে।
দেশে দিনে গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। বর্তমানে সরবরাহ হচ্ছে ২৬৫ কোটি ঘনফুট, যার মধ্যে ৯৫ কোটি ঘনফুট এলএনজি থেকে আসে। গ্রীষ্মকালীন বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণের জন্য ১০৫ কোটি ঘনফুটে আমদানি বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এলএনজি আমদানি ব্যাহত হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে লোডশেডিং সৃষ্টি হতে পারে।
বিপিসি বলছে, ডিজেলের মজুত দেশব্যাপী ১৪-১৫ দিন চলবে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, বাংলাদেশ সম্পূর্ণভাবে আমদানিনির্ভর। একাধিক চালান বিলম্বিত হলে কৃষি, বিদ্যুৎ ও পরিবহন খাতে জটিলতা দেখা দিতে পারে। সরকারের পক্ষ থেকে বিকল্প উৎস ও আমদানির সময়সূচি নিয়ে আলোচনা চলছে।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, রাস তানুরা শোধনাগারের বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালিতে অনিশ্চয়তা বিষয়টি সরকার পর্যবেক্ষণ করছে। সরবরাহে কোনো বিঘ্ন না ঘটে, তা নিশ্চিত করতে বিকল্প ব্যবস্থা প্রণয়ন করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশকে নতুন উৎস থেকে তেল ও গ্যাস আমদানি বাড়াতে হবে, না হলে মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকট এড়িয়ে চলা কঠিন হবে।