খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ১০ জানুয়ারি ২০২৬
ইরানের রাজনৈতিক আকাশে এখন এক অস্থির সময় বিরাজ করছে। টানা দুই সপ্তাহ ধরে চলা নজিরবিহীন সরকারবিরোধী আন্দোলনের মুখে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এক কঠোর ও চ্যালেঞ্জিং অবস্থান ঘোষণা করেছেন। শুক্রবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক বিশেষ ভাষণে তিনি স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন যে, কোনো অবস্থাতেই ইসলামিক রিপাবলিক বিক্ষোভকারীদের দাবির মুখে নতিস্বীকার করবে না বা পিছু হটবে না। একই সঙ্গে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তীব্র সমালোচনা করে তাঁর করুণ পতনের ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন।
বিক্ষোভের তীব্রতা ও ডিজিটাল ব্ল্যাকআউট
গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ইরানের প্রধান প্রধান শহরগুলোতে নেতৃত্ববিরোধী জনতা ‘স্বৈরশাসকের মৃত্যু হোক’ স্লোগান দিয়ে রাজপথ প্রকম্পিত করে। অনেক জায়গায় সরকারি ভবনে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। এই গণবিক্ষোভ দমনে ইরান সরকার অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ইন্টারনেট পর্যবেক্ষক সংস্থা ‘নেটব্লকস’ জানিয়েছে, কর্তৃপক্ষ দেশজুড়ে সম্পূর্ণ ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। সংস্থাটির তথ্যমতে, শুক্রবার ভোর পর্যন্ত ইরান টানা ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ডিজিটাল দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন বা ‘অফলাইন’ অবস্থায় ছিল। এই বিক্ষোভকে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর দেশটির ধর্মতান্ত্রিক শাসনের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইরানের বর্তমান বিক্ষোভ ও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপট নিচের সারণিতে তুলে ধরা হলো:
| বিষয়ের ক্ষেত্র | বিস্তারিত প্রেক্ষাপট ও তথ্য |
|---|---|
| বিক্ষোভের বর্তমান স্থিতি | টানা দুই সপ্তাহ ধরে চলমান (৩ জানুয়ারি থেকে তীব্রতর)। |
| সরকারের পদক্ষেপ | দেশজুড়ে পূর্ণাঙ্গ ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ও বলপ্রয়োগ। |
| খামেনির অবস্থান | বিক্ষোভকারীদের ‘নাশকতাকারী’ আখ্যা দিয়ে কঠোর দমনের নির্দেশ। |
| যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা | বিক্ষোভের প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রকাশ্য সমর্থন ও হামলার হুমকি। |
| ঐতিহাসিক তুলনা | খামেনি ট্রাম্পকে ক্ষমতাচ্যুত শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির সাথে তুলনা করেছেন। |
| মার্কিন আলটিমেটাম | বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা হলে কঠোর সামরিক আঘাত হানার ঘোষণা। |
ট্রাম্পের পতন ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
বিক্ষোভের পর এটিই ছিল খামেনির প্রথম সরাসরি ভাষণ। ভাষণে তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘অহংকারী’ নেতা হিসেবে অভিহিত করেন এবং বলেন যে, ট্রাম্পের হাত এক হাজারেরও বেশি ইরানির রক্তে রঞ্জিত। তিনি ইঙ্গিত করেন, গত বছরের জুন মাসে ইরানের বিরুদ্ধে সংঘটিত যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি মদত দিয়েছিল। খামেনি ১৯শে শতকের ইরানি রাজবংশের পতনের উদাহরণ টেনে বলেন, “ট্রাম্পের জানা উচিত, মোহাম্মদ রেজা শাহের মতো বিশ্ব স্বৈরশাসকরা তাদের অহংকারের চূড়ায় পৌঁছেই পতনের মুখে পড়েছিল। তাকেও একদিন একইভাবে পতন বরণ করতে হবে।”
পাল্টাপাল্টি হুমকি ও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ
অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের এই আন্দোলনকে ‘শাসন উৎখাত করার উদ্দীপনা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন যে, তেহরান যদি বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রাণঘাতী হামলা চালায়, তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানে কঠোর আঘাত হানতে প্রস্তুত রয়েছে। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প আরও দাবি করেন যে, ৮৬ বছর বয়সী খামেনি ক্ষমতা হারিয়ে হয়তো দেশ ছাড়ার পথ খুঁজছেন। তবে খামেনি এই দাবি নাকচ করে দিয়ে সমর্থকদের উদ্দেশে বলেছেন, ইসলামিক রিপাবলিক অসংখ্য শহীদের রক্তের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত, যা গুটিকয়েক নাশকতাকারীর ভয়ে ভেঙে পড়বে না।
ইরানের এই অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং বিশ্ব রাজনীতিতেও নতুন উত্তেজনার জন্ম দিচ্ছে। একদিকে খামেনির অনড় অবস্থান এবং অন্যদিকে ট্রাম্পের সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি একটি বড় ধরণের আঞ্চলিক যুদ্ধের দিকে ধাবিত হচ্ছে কি না, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।