সাদেক শিবলী
প্রকাশ: শনিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫
বাংলাদেশের রাজনীতি ও শিক্ষাঙ্গনের ইতিহাসে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা সবসময়ই বিতর্কিত। স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রজন্ম তাদেরকে “রাজাকার” বা “বেইমান” হিসেবে দেখেছে। এই পটভূমিতেই জামায়াতের ছাত্র সংগঠন—ছাত্রশিবির—উত্থান ঘটায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে, বিশেষ করে দেশের সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
প্রশ্ন জাগে—যে সংগঠন প্রকাশ্যে কার্যক্রম চালাতে দীর্ঘ ১৭ বছর ব্যর্থ, হঠাৎ করেই কীভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৪ হাজার শিক্ষার্থীকে প্রভাবিত করতে সক্ষম হলো?
বিভ্রমের সূত্র
অনেকে বলেন, শিবিরের দেওয়া পানির ফিল্টার, লিফলেট কিংবা বক্তাদের লেকচারই শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করেছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সত্য হলো—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ১৪ হাজার শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে, তারা আগে থেকেই শিবিরের মতাদর্শে বিশ্বাসী। সংগঠন তাদের ভর্তির সুযোগ, থাকার জায়গা, পড়াশোনার উপকরণ এমনকি অর্থনৈতিক ও চিকিৎসা সহায়তা দিয়েছে।
কোচিং সেন্টারের জাল
প্রতি বছর সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৫৪,৫১৫ আসনের বিপরীতে কয়েক লক্ষ শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেয়। এক জরিপ বলছে, ভর্তি হওয়া ৯৩% শিক্ষার্থী কোনো না কোনো কোচিং সেন্টারের মাধ্যমে প্রস্তুতি নেয়। এখানেই গড়ে ওঠে শিবিরের নিয়ন্ত্রণ।
শিবির-নিয়ন্ত্রিত বলে গুঞ্জন রয়েছে এমন জনপ্রিয় কোচিং সেন্টারের নাম—উদ্ভাস, উন্মেষ, রেটিনা, ফোকাস, সাকসেস, ফেমাস, কনটেস্ট, কনসেপ্ট, প্রতিভা, প্রবাহ, রেডিয়াম, আল্টিমাম প্রভৃতি। মালিকানা ও সাফল্যের পরিসংখ্যান গোপন রাখা, বারবার প্রশ্নফাঁসের অভিযোগের সঙ্গে নাম না আসা—সবই ইঙ্গিত করে এক অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার দিকে।
প্রশ্নফাঁসের কালো ছায়া
২০১৫, ২০১৬, ২০১৮, ২০১৯ এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালে বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রশ্নফাঁসের খবর প্রকাশ করেছে। কিন্তু অভিযোগের তীর সবসময় গিয়েছে শিক্ষার্থী বা প্রেসকর্মীদের দিকে। অথচ প্রকৃত শক্তি থেকে গেছে আড়ালে।
ধরা যাক—যদি বছরে ১০ হাজার শিক্ষার্থীকে ১ লাখ টাকা করে প্রশ্নফাঁসের প্রশ্ন সরবরাহ করা যায়, তাহলে টাকার অঙ্ক দাঁড়ায় ১ বিলিয়ন টাকা! এত বড় ব্যবসা এক বছরে কি থেমে যেতে পারে? স্বাভাবিকভাবেই না। এই বিশাল অর্থনৈতিক শক্তি এবং গোপন প্রভাবই তাদেরকে অদৃশ্য অথচ কার্যকর রাখে।
ইতিহাসের ঠগীদের মতো
১৩শ থেকে ১৯শ শতক পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশে সক্রিয় ছিল ঠগী গোষ্ঠী। তারা ভ্রমণকারীদের আস্থা অর্জন করে, নির্জনে নিয়ে গিয়ে গোপনে হত্যা করত। নিজেদের গোপন সংকেত, ভাষা ও সংগঠনের মাধ্যমে টিকে ছিল শতাব্দীর পর শতাব্দী।
আজকের প্রশ্নফাঁস ও গোপন কোচিং সাম্রাজ্য অনেকটা সেই ঠগীদের আধুনিক সংস্করণ। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের আস্থাকে ব্যবহার করে, ভবিষ্যৎকে বন্ধক রেখে তারা গড়ে তুলছে এক অদৃশ্য দাসত্ব—যেখানে টাকার বিনিময়ে শুধু ভর্তির সুযোগ নয়, মতাদর্শিক আনুগত্যও কিনে নেওয়া হয়।
অতএব, প্রশ্ন কেবল একটি—আমরা কি নতুন এক “ঠগী সংস্কৃতির” উত্থানের সাক্ষী নই?
খবরওয়ালা/এমএজেড