খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ে বইছে বসন্তের হাওয়া। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও প্রবাসীদের পাঠানো আয়ে দেখা যাচ্ছে এক অবিস্মরণীয় উল্লম্ফন। বিশেষ করে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যাংকিং চ্যানেলের ওপর প্রবাসীদের আস্থা বৃদ্ধি পাওয়ায় রেমিট্যান্স প্রবাহে নতুন গতি সঞ্চার হয়েছে। চলতি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে এসে প্রবাসী আয়ের এই ধারা এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে, যা দেশের ইতিহাসে একক মাসের হিসেবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আয়ের রেকর্ড গড়ল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, চলতি ডিসেম্বরের প্রথম ২৯ দিনেই প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ৩ বিলিয়ন ৪ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স। বর্তমান বাজার দর (প্রতি ডলার ১২২ টাকা) অনুযায়ী দেশীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩৭ হাজার ১০০ কোটি ২০ লাখ টাকা। এর আগে কেবল ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মার্চ মাসে ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে ৩.২৯ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স এসেছিল, যা এখন পর্যন্ত দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ। ডিসেম্বরের এই অর্জন সেই রেকর্ডকে স্পর্শ না করলেও একক মাস হিসেবে দ্বিতীয় শীর্ষস্থান দখল করে নিয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত বছরের ডিসেম্বরের তুলনায় এবারের প্রবৃদ্ধি চোখে পড়ার মতো। গত বছর এই সময়ে যেখানে রেমিট্যান্স এসেছিল ২৪২ কোটি ১০ লাখ ডলার, সেখানে এবার তা ২৯ দিনেই ৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বৈধ পথে টাকা পাঠানোর জন্য সরকারি প্রণোদনা এবং হুন্ডি রোধে কড়াকড়ি এই অভাবনীয় সাফল্যে বড় ভূমিকা রেখেছে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মাসভিত্তিক রেমিট্যান্স চিত্র
| মাস (২০২৫) | রেমিট্যান্সের পরিমাণ (মিলিয়ন ডলারে) | প্রবৃদ্ধির হার ও মন্তব্য |
|---|---|---|
| জুলাই | ২৪৭.৭৮ | অর্থবছরের শুরু থেকেই ঊর্ধ্বমুখী |
| আগস্ট | ২৪২.১৯ | ধারাবাহিকতা বজায় ছিল |
| সেপ্টেম্বর | ২৬৮.৫৮ | বড় ধরনের উল্লম্ফন |
| অক্টোবর | ২৫৬.৩৫ | স্থিতিশীল প্রবাহ |
| নভেম্বর | ২৮৮.৯৫ | ৩ বিলিয়নের কাছাকাছি পৌঁছানোর ইঙ্গিত |
| ডিসেম্বর (২৯ তারিখ পর্যন্ত) | ৩০৪১.০ | ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেকর্ড |
| মোট (জুলাই-ডিসেম্বর ২৮) | ১৬,০৭৯.০ | ১৭.৭% বার্ষিক প্রবৃদ্ধি |
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানান, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই থেকে ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত) মোট রেমিট্যান্স এসেছে ১ হাজার ৬০৭ কোটি ৯০ লাখ ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এটি প্রায় ২৪২ কোটি ডলার বেশি। শতকরা হিসেবে এ সময়ে প্রবাসী আয়ে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ১৭.৭ শতাংশ। ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রক্রিয়া সহজ করা এবং এক্সচেঞ্জ হাউসগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণের ফলে প্রবাসীরা এখন অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্যে দেশে টাকা পাঠাতে পারছেন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রেমিট্যান্সের এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রবাসীদের মাঝে ‘দেশ গড়ার’ যে আবেগ তৈরি হয়েছে, তা তারা বৈধ পথে টাকা পাঠিয়ে প্রমাণ করছেন। বছরের শেষ এই প্রাপ্তি আগামী ২০২৬ সালের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পথে একটি শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।