খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক:
প্রকাশ: বুধবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫
দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের (বর্তমান পদ নাম শিক্ষক) ১১তম গ্রেড বাস্তবায়নসহ তিন দফা দাবিতে আল্টিমেটাম দিয়ে আবারও আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ‘বাংলাদেশ প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক সংগঠন ঐক্য পরিষদ’।
অপরদিকে দ্রুত সমস্যা সমাধানে সহকারী শিক্ষকদের দাবির বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবনাও দিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কনসালটেশন কমিটির প্রতিবেদন ও শিক্ষকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বেতন গ্রেড বাস্তবায়ন প্রস্তাবনায় সহকারী শিক্ষকদের ১১তম গ্রেড এবং ১২তম গ্রেডের আর্থিক সংশ্লেষসহ যৌক্তিকতা তুলে ধরা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে শিক্ষকদের দাবি বাস্তবায়ন কবে নাগাদ হবে তা নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। কারণ জাতীয় বেতন কমিশনের জন্য জাতীয় বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা সময় সাপেক্ষ বিষয়।
জানতে চাইলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান বলেন, ‘অধিদফতর থেকে যৌক্তিকতাসহ সুপারিশ দিয়েছি মন্ত্রণালয়ে। মন্ত্রণালয় আমাদের সঙ্গে একমত পোষণ করে পে-কমিশনের চেয়ারম্যানের কাছে সুপারিশ পাঠিয়ে দিয়েছে। হয়তো আগামী সপ্তাহে পে-কমিশনের চেয়ারম্যানের সঙ্গে শিক্ষক প্রতিনিধিদের সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দেবো।’
১১তম গ্রেড নাকি ১২তম গ্রেড বাস্তবায়ন করা হবে জানতে চাইলে মহাপরিচালক বলেন, ‘আমরা যুক্তিসহ ১১তম ও ১২তম গ্রেড বাস্তবায়নের প্রস্তাবনা দিয়েছি, সিদ্ধান্ত নেবে কমিশন।’
জাতীয় বেতন কমিশনে ১১তম গ্রেডের সুপারিশ
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্প্রতি জাতীয় বেতন কমিশনের কাছে ১১তম গ্রেডে শিক্ষকদের বেতন নির্ধারণের সুপারিশ করে প্রস্তাব পাঠিয়েছে। এতে বলা হয়, মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন ৬৫ হাজার ৫৬৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিপরীতে অনুমোদিত সহকারী শিক্ষক পদ ৩ লাখ ৬৯ হাজার ২১৬টি। বর্তমানে সহকারী শিক্ষক কর্মরত আছেন ৩ লাখ ৫২ হাজার ২০৮ জন। আর শূন্য পদ ১৭ হাজার ৮টি। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদের বিদ্যমান বেতন গ্রেড জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫-এর ১৩তম গ্রেড। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা ২০১৯ অনুযায়ী সহকারী শিক্ষকের শিক্ষাগত যোগ্যতা দ্বিতীয় শ্রেণি বা সমমানের সিজিপিএসহ স্নাতক বা স্নাতক (সম্মান) বা সমমানের ডিগ্রি। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বা বিভাগ, অধিদফতর ও দফতরে সমমানের যোগ্যতার শিক্ষক বা কর্মকর্তারা দশম গ্রেডে বেতন ভাতা পান বলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা বেতন স্কেল উন্নীত করে জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫-এর দশম গ্রেডে বেতন ভাতাদি প্রদানের জন্য দাবি উপস্থাপন করেছেন।
সহকারী শিক্ষকদের আন্দোলন প্রেক্ষাপট
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০০৬ সালের ২৮ আগস্ট পর্যন্ত প্রধান শিক্ষকের পরের ধাপে চাকরি করতেন সহকারী শিক্ষকরা। ওই বছর ২৯ আগস্ট তাদের মধ্যে দুই ধাপ বেতন বৈষম্য সৃষ্টি হলে সহকারী শিক্ষকরা শিক্ষক সমিতি থেকে আলাদা হয়ে তাদের বেতন বৈষম্য নিরসনের আন্দোলন শুরু করেন।
নতুন করে আন্দোলনে সহকারী শিক্ষকরা
সহকারী শিক্ষকদের ১১তম গ্রেডে বেতন নির্ধারণের দাবির মধ্যেই বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কনসালটেশন কমিটি সহকারী শিক্ষকদের ১২তম গ্রেড বেতন নির্ধারণের সুপারিশ করে। এই সুপারিশ প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলনে নামেন সহকারী শিক্ষকরা।
সর্বশেষ গত ৩০ আগস্ট ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মহাসমাবেশ করেন প্রাথমিক শিক্ষকরা। মহাসমাবেশ করে শিক্ষকরা প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করে কর্মসূচি ঘোষণা করেন। ঘোষিত কর্মসূচিতে বলা হয়, আগামী ২৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দাবি বাস্তবায়ন না হলে ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আমরণ অনশন শুরু করবেন শিক্ষকরা।
সমাবেশ থেকে তিন দফা দাবি উত্থাপন করে ‘বাংলাদেশ প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক সংগঠন ঐক্য পরিষদ’।
বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ শামছুদ্দীন মাসুদ বাংলা বলেন, বৈষম্য নিরসনকারী সরকারের কাছে তাদের সবিনয় অনুরোধ—প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য কমিয়ে সহকারী শিক্ষকদের ১১তম গ্রেডে বেতন নির্ধারণ করতে হবে। আগামী ২৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সহকারী শিক্ষকদের দাবি মেনে না নিলে ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সহকারী শিক্ষকদের সংগঠন আমরণ অনশন করবে।
তিন দফা দাবি তুলে ধরে শামছুদ্দীন মাসুদ আরও বলেন, ১০ বছর ও ১৬ বছরের উচ্চতর গ্রেড প্রদানে উন্নীত স্কেলকে উচ্চতর গ্রেড হিসেবে বিবেচনা করে শিক্ষকদের উচ্চতর গ্রেড থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। শিক্ষকদের ২০২০ সালের ২ সেপ্টেম্বর থেকে চাকরি উচ্চতর গ্রেড প্রদানে গণনা করা হচ্ছে না, যা মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন। উন্নীত স্কেলকে উচ্চতর গ্রেড হিসেবে বিবেচনা না করে ১০ ও ১৬ বছরের উচ্চতর গ্রেড দিতে হবে।
শিক্ষকরা সমাবেশে জানান, ২০০৯ সাল থেকে পদোন্নতি বন্ধ ছিল। ২০১৭-১৮ সালে সহকারী শিক্ষকদের চলতি দায়িত্বে পদোন্নতি দেওয়া হয়। তাদের স্থায়ী করার কোনও ব্যবস্থা করা হয়নি। ২০২৪ সালে কয়েকটি উপজেলায় পদোন্নতি দিলেও এখনও ৩২ হাজার প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য।
বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি মো. আবুল কাসেম শিক্ষকদের দাবির বিষয়ে বলেন, ‘সহকারী শিক্ষকদের ১১তম গ্রেডে বেতন নির্ধারণ, ২০১৪ সালের ৯ মার্চ থেকে সব প্রধান শিক্ষকদের দশম গ্রেডের জিও জারি, চলতি দায়িত্বসহ সিনিয়র শিক্ষকদের শতভাগ বিভাগীয় পদোন্নতি এবং ১০ বছর ও ১৬ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড প্রদানের জন্য আমরা আন্দোলন করে আসছিলাম। সরকার দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের দশম গ্রেড বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমি মনে করি, সহকারী শিক্ষকদের দ্রুত ১১তম গ্রেড বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। এছাড়া পিএসসি কর্তৃক সরাসরি প্রধান শিক্ষকের যে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে, আমরা এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। এই বিজ্ঞপ্তি স্থগিত করে আগে পদোন্নতি দিতে হবে।
শিক্ষকদের তিন দাবি
১. সহকারী শিক্ষকদের এন্ট্রি পদে ১১তম গ্রেডে বেতন নির্ধারণ করতে হবে।
২. প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদে শতভাগ পদোন্নতির মাধ্যমে প্রধান শিক্ষক পদ পূরণ করতে হবে।
৩. ১০ বছর ও ১৬ বছরের উচ্চতর গ্রেড প্রদানে উন্নীত স্কেলকে উচ্চতর গ্রেড হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
খবরওয়ালা/এমইউ