খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ৯ মার্চ ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে ইরান ও রাশিয়ার মধ্যকার সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি তেহরান ও মস্কোর মধ্যকার গভীর সামরিক সহযোগিতার বিষয়টি পুনরায় নিশ্চিত করেছেন। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, এই দুই দেশের মধ্যকার অংশীদারত্ব কোনো সাময়িক বিষয় নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী এবং কৌশলগত অঙ্গীকারের অংশ। আজ রোববার (৮ মার্চ) মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এসব গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন।
আব্বাস আরাকচি তার সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেন যে, ইরান ও রাশিয়ার মধ্যকার সামরিক সহযোগিতা কোনো নতুন ঘটনা বা গোপন বিষয় নয়। তিনি বলেন, “আমাদের মধ্যে একটি শক্তিশালী কৌশলগত অংশীদারত্ব বিদ্যমান। রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক সহযোগিতামূলক সম্পর্ক বহু বছরের পুরোনো এবং এটি বর্তমানের মতো ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।” তার এই বক্তব্য মূলত পশ্চিমা দেশগুলোর উদ্বেগের প্রতি একটি পরোক্ষ বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে, যারা ইরান-রাশিয়া সামরিক জোটকে বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে আসছে।
সাক্ষাৎকারে আরাকচির কাছে একটি চাঞ্চল্যকর গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। গণমাধ্যমের ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েনকৃত মার্কিন সেনাদের অবস্থান শনাক্ত করতে এবং তাদের ওপর নিখুঁতভাবে হামলা চালাতে ইরানকে গোয়েন্দা তথ্য ও প্রযুক্তি দিয়ে সহযোগিতা করছে রাশিয়া। এই স্পর্শকাতর প্রশ্নটির জবাবে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরাসরি বিষয়টি অস্বীকার করেননি। বরং তিনি কূটনৈতিক কৌশলের আশ্রয় নিয়ে বলেন, “রাশিয়ার সঙ্গে আমাদের দীর্ঘদিনের সামরিক সম্পর্ক রয়েছে, তবে এই সুনির্দিষ্ট বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য আমার কাছে নেই।”
ইরান ও রাশিয়ার মধ্যকার সামরিক সহযোগিতার প্রধান ক্ষেত্রসমূহ
| সহযোগিতার খাত | বিবরন ও বর্তমান অবস্থা |
| গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় | ড্রোন ও স্যাটেলাইট প্রযুক্তির মাধ্যমে কৌশলগত তথ্য আদান-প্রদান। |
| প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম | রাশিয়ার কাছ থেকে উন্নত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও যুদ্ধবিমান ক্রয়। |
| প্রযুক্তিগত সহায়তা | মিসাইল ও প্রিসিশন-গাইডেড অস্ত্রের আধুনিকায়নে রাশিয়ার কারিগরি জ্ঞান। |
| যৌথ মহড়া | পারস্য উপসাগর ও কাস্পিয়ান সাগরে নিয়মিত নৌ ও বিমান মহড়া পরিচালনা। |
| আঞ্চলিক নিরাপত্তা | মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা আধিপত্য মোকাবিলায় অভিন্ন কৌশল গ্রহণ। |
ইরান বর্তমানে রাশিয়ার কাছ থেকে বড় ধরনের কোনো সাহায্য পাচ্ছে কি না—এমন প্রশ্নের উত্তরে আরাকচি বলেন, দুই দেশ বছরের পর বছর ধরে পারস্পরিক সামরিক স্বার্থ রক্ষা করে চলেছে। তিনি পুনরুল্লেখ করেন যে, রাশিয়া ইরানকে বিভিন্ন দিক থেকে সাহায্য করছে এবং এই সহযোগিতা অত্যন্ত সুসংহত। রাশিয়ার অত্যাধুনিক রাডার ও ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার প্রযুক্তি ইরানকে মার্কিন লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে সহায়তা করছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিস্তারিত সামরিক তথ্য তার কাছে না থাকলেও দুই দেশের সম্পর্ক এখন ইতিহাসের সবচেয়ে দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির কারণে তেহরান ও মস্কো একে অপরের ওপর আগের চেয়ে অনেক বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। একদিকে ইরান যেমন রাশিয়াকে ড্রোন ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করছে, অন্যদিকে রাশিয়াও ইরানকে উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে সহায়তা করছে। এই পাল্টাপাল্টি সহযোগিতা মূলত ওয়াশিংটনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাকচির এই সাক্ষাৎকারটি এমন এক সময়ে এলো যখন মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ওপর হামলার ঝুঁকি বেড়েছে এবং ইরান ও রাশিয়ার মধ্যকার একটি নতুন ‘কৌশলগত চুক্তি’ স্বাক্ষরের প্রস্তুতি চলছে। তার এই খোলামেলা স্বীকারোক্তি ইঙ্গিত দেয় যে, আগামী দিনগুলোতে এই দুই পরাশক্তির সামরিক সখ্যতা আরও নিবিড় হবে।