খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬
দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন জনপদে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) সামরিক তৎপরতা গত কয়েক দিনে এক বিধ্বংসী রূপ ধারণ করেছে। লেবাননের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সি (এনএনএ) জানিয়েছে, ইসরায়েলি বাহিনী স্থল ও আকাশপথ থেকে বহুমুখী আক্রমণ পরিচালনা করছে। এই হামলায় ভারী কামানের গোলা, শক্তিশালী আকাশপথের বোমা এবং আন্তর্জাতিকভাবে বিতর্কিত সাদা ফসফরাস শেল ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। ক্রমাগত এই সামরিক অভিযানের ফলে সীমান্তবর্তী শহরগুলোতে মানবিক পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটেছে।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি বিমান হামলায় বাজুরিয়েহ, নাবাতিয়েহ আল ফাউকা, সির আল ঘারবিয়েহ এবং চৌকাইন শহরে অন্তত পাঁচজন প্রাণ হারিয়েছেন। বিশেষ করে বিনতে জবেইল শহরটি দীর্ঘ সময় ধরে ইসরায়েলি বাহিনীর অবিরাম আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। শহরটির অবকাঠামো এই দীর্ঘস্থায়ী গোলাবর্ষণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।
টায়ার জেলার বিভিন্ন অংশেও আক্রমণের তীব্রতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এনএনএ-র তথ্যমতে, মাজদাল জুন এবং বাইত আল-সাইয়াদ শহরে নতুন করে বিমান হামলা চালানো হয়েছে। একই সময়ে আল-হানিয়া, আল-কালিলাহ, আল-মানসুরি এবং বেইত আল-সাইয়াদ শহরগুলোতে ভারী কামানের গোলাবর্ষণ করা হয়েছে। এছাড়া সিদ্দিকিন শহরে যুদ্ধবিমান থেকে শক্তিশালী বোমা বর্ষণ করা হয়েছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
দক্ষিণ লেবাননের জিবকিন শহরে ইসরায়েলি বাহিনী কামানের গোলার পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ ও বিতর্কিত সাদা ফসফরাস শেল ব্যবহার করেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। সাদা ফসফরাস একটি অত্যন্ত দাহ্য রাসায়নিক পদার্থ যা বাতাসের সংস্পর্শে আসার সাথে সাথে জ্বলতে শুরু করে এবং ৮০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা সৃষ্টি করতে পারে। এটি মানবদেহে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করার পাশাপাশি পরিবেশ ও কৃষিজমির দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি করে। আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এই রাসায়নিকের ব্যবহার যুদ্ধাপরাধের শামিল বলে গণ্য হয়।
নিচে দক্ষিণ লেবাননের সাম্প্রতিক হামলার প্রধান আক্রান্ত এলাকা ও ক্ষয়ক্ষতির একটি তালিকা প্রদান করা হলো:
| আক্রান্ত জেলা/শহর | আক্রমণের ধরন | হতাহত/ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ |
| বাজুরিয়েহ, নাবাতিয়েহ আল ফাউকা | বিমান হামলা | ৫ জন নিহতের খবর নিশ্চিত করা হয়েছে |
| বিনতে জবেইল | অবিরাম স্থল ও আকাশ হামলা | দীর্ঘস্থায়ী গোলাবর্ষণে অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি |
| জিবকিন শহর | ফসফরাস শেল ও কামানের গোলা | রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও পরিবেশের ক্ষতি |
| সিদ্দিকিন ও মাজদাল জুন | শক্তিশালী বিমান হামলা | আবাসিক এলাকায় জানমালের নিরাপত্তা বিঘ্নিত |
| আল-হানিয়া ও আল-কালিলাহ | ভারী কামানের গোলাবর্ষণ | কৃষি ও সাধারণ বসতি ক্ষতিগ্রস্ত |
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর এই বহুমুখী আক্রমণ দেশটির দক্ষিণ সীমান্ত সংলগ্ন জনপদগুলোতে এক গভীর মানবিক সংকট সৃষ্টি করেছে। সীমান্ত এলাকার কয়েক হাজার মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। স্থানীয় হাসপাতালগুলো ক্রমবর্ধমান আহতদের চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছে। বিশেষ করে ফসফরাস শেলের ব্যবহারের ফলে শ্বাসকষ্ট এবং ত্বকের গভীর ক্ষত নিয়ে আসা রোগীদের সংখ্যা বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, লেবানন ও ইসরায়েল সীমান্তের বর্তমান উত্তেজনা ২০০৬ সালের যুদ্ধের পর সবচেয়ে ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইসরায়েলি বাহিনীর ক্রমাগত কামানের গোলা এবং বিমান হামলা কেবল সামরিক লক্ষ্যবস্তু নয়, বরং বেসামরিক জনপদগুলোকেও বিপর্যস্ত করে তুলছে। আমজনতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় এড়াতে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হলেও সংঘাত থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। দক্ষিণ লেবাননের সামগ্রিক পরিস্থিতি বর্তমানে অত্যন্ত অস্থিতিশীল এবং ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।