খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
জ্যৈষ্ঠ মাসের প্রচণ্ড দাবদাহে যখন চারদিক পুড়ছে, ঠিক তখনই যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার চতুরবাড়িয়া থেকে খাজুরা অভিমুখী সড়কের আরামবাগ মোড়ে একটি বটগাছের সুশীতল ছায়ায় এসে থামল একটি পুরোনো বাইসাইকেল। এই দ্বিচক্রযানের পেছনের দুই পাশে শক্ত করে বাঁধা রয়েছে দুটি বাঁশের ঝুড়ি, যা ডিম দিয়ে পরিপূর্ণ। রডের সাথে শক্ত করে বাঁধা একটি ছাতা এবং সামনের হ্যান্ডেলে ঝুলছে একটি থলে। সেই থলের অভ্যন্তরে রয়েছে পানির বোতল, কিছু জরুরি ওষুধ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু জিনিসপত্র। ঘামে সম্পূর্ণ ভিজে যাওয়া সাইকেলচালক মাথায় একটি টুপি পরে বাইসাইকেল থেকে নেমে কিছুক্ষণ জিরিয়ে নেওয়ার জন্য বটগাছের নিচে দাঁড়ালেন।
বিগত ৪ জুন বৃহস্পতিবার দুপুরে এই ডিম বিক্রেতার সাথে কথা বলে জানা যায় তার জীবনের নির্মম বাস্তবতার কথা। তার নাম লাল মিয়া (৫৪)। তিনি মাগুরা জেলার শালিখা উপজেলার ছোট আমিয়ান নামক গ্রামের একজন স্থায়ী বাসিন্দা। দীর্ঘ ৩২ বছর ধরে তিনি প্রতিদিন প্রায় ৫০ কিলোমিটার পথ নিজের বাইসাইকেল চালিয়ে বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে ঘুরে ডিম ক্রয় করেন এবং পরবর্তীতে তা বিক্রি করে নিজের সংসার পরিচালনা করেন। লাল মিয়ার পরিবারে দুই মেয়ে এবং এক ছেলে রয়েছে। তিনি ইতিপূর্বেই তার দুই মেয়ে ও এক ছেলের বিবাহ সম্পন্ন করেছেন। তার ছেলে আলামিন গাজী (২৬) বর্তমানে রাজধানী ঢাকায় একটি পোশাক প্রস্তুতকারক কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কর্মরত আছেন এবং তিনি নিজের পরিবার পরিজন নিয়ে সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। অন্যদিকে গ্রামের বাড়িতে বর্তমানে লাল মিয়া এবং তার স্ত্রী চম্পা বেগম (৪৪) একসাথে বসবাস করেন।
কথায় কথায় লাল মিয়া জানান, জীবনের ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় তিনি একসময় বিদেশ যাওয়ার সুপ্ত স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু তার সেই স্বপ্ন কোনোদিনই পূরণ হয়নি। উল্টো প্রতারক দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে তিনি তার জীবনের সমস্ত সঞ্চয় হারিয়েছেন। বিদেশ যাত্রার অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে তাকে নিজের চার বিঘা কৃষি জমি এবং সাড়ে ১২ শতক ওজনের পৈত্রিক বসতভিটা পর্যন্ত বিক্রি করে দিতে হয়েছে। তবে জীবনের এত বড় প্রতিকূলতার কাছেও তিনি কখনো হার মানেননি। সব বাধা উপেক্ষা করে বাইসাইকেল চালিয়ে গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে হাঁস ও মুরগির ডিম সংগ্রহ করে তা বিক্রির মাধ্যমে তিনি আজও নিজের সংসারের হাল ধরে রেখেছেন। বিদেশ যাওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি নিজের মাঠের জমি ও বসতভিটা বিক্রি করে দালালের হাতে চার দফায় সর্বমোট প্রায় সাড়ে ১০ লাখ টাকা তুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি বিদেশ যেতে পারেননি এবং সেই টাকাও আর ফেরত পাননি। ফলে বর্তমানে তিনি অন্যের দেওয়া জায়গায় একটি ছোট ঘর তৈরি করে অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করছেন।
লাল মিয়ার প্রতারিত হওয়ার চার দফার আর্থিক বিবরণ নিচে তালিকার মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| ক্রমিক | প্রতারণার বছর | গন্তব্য দেশ | দালালের হাতে দেওয়া টাকার পরিমাণ |
| ১ | ২০০২ | সৌদি আরব | ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা |
| ২ | ২০০৬ | মালয়েশিয়া | ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা |
| ৩ | ২০১০ | মালয়েশিয়া | ৩ লাখ টাকা |
| ৪ | २०१২ | দুবাই | ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা |
| মোট | — | চারটি দেশ | সাড়ে ১০ লাখ টাকা |
লাল মিয়া সপ্তাহে একদিন পরপর বাইসাইকেলে চড়ে বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে ঘুরে ডিম কেনেন এবং সপ্তাহের বাকি তিনদিন সেই সংগৃহীত ডিম বাজারে বিক্রি করেন। যেদিন তিনি ডিম ক্রয় করতে বের হন, সেদিন আর ডিম বিক্রি করার মতো পর্যাপ্ত সময় তার হাতে থাকে না। এছাড়া প্রতি সপ্তাহের শুক্রবার দিনটি তিনি নিজের বাড়িতেই কাটান। ডিম সংগ্রহের জন্য তিনি মাগুরার শালিখা উপজেলার ধনেশ্বরগাতী, সিংড়া, তিলখড়ি, দেবিলী, ধাউখালী, বগুড়া, কোটভাগ, মশাখালী, শ্রীফলতলা এবং ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার পান্তাডাঙি, কামালপুর, বিনোদপুর, মল্লিকপুর, তালা, তেঘোর, দামোদরপুর, মির্জাপুর, নাকড়াসহ প্রায় ৫০টি গ্রামের পাড়ায় পাড়ায় এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে ডিম সংগ্রহ করেন।
মাঝে মাঝে তিনি বড় ডিম ব্যবসায়ী বা ব্যাপারীদের কাছ থেকেও হাঁস ও মুরগির ডিম পাইকারি দরে কিনে নেন। গ্রামের সাধারণ মানুষের বাড়ি থেকে তিনি প্রতি হালি হাঁস ও মুরগির ডিম ৫০ টাকা দরে ক্রয় করে বাজারে ৬০ টাকা দরে বিক্রি করেন। তবে বড় ব্যাপারীদের কাছ থেকে ডিম কিনলে ডিমের ক্রয়মূল্য কিছুটা বেশি পড়ে এবং এর ফলে তার লাভের পরিমাণও অনেক কমে যায়। সব মিলিয়ে প্রতি মাসে ডিম বিক্রি করে তার গড়ে ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হয়ে থাকে।
লাল মিয়ার বাইসাইকেলের একটি ঝুড়িতে ৫০০টি হাঁসের ডিম এবং অপর ঝুড়িতে ৩০০টি মুরগির ডিম বাসের ঝুড়িতে সাজানো থাকে। প্রতিদিন ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে প্রাতরাশ সম্পন্ন করেই তিনি নিজের বাইসাইকেল নিয়ে ডিমের সন্ধানে বেড়িয়ে পড়েন। এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে ঘুরতে ঘুরতে কখনো সন্ধ্যা আবার কখনো গভীর রাত হয়ে যায়। সংগৃহীত এই ডিমগুলো তিনি বাজারের বিভিন্ন দোকানে পাইকারি দরে এবং চলতি পথে সাধারণ মানুষের কাছে খুচরা মূল্যে বিক্রি করেন। রোদ, ঝড়-বৃষ্টি কিংবা শীতের তীব্রতা যাই হোক না কেন, জীবন ধারণের তাগিদে তাকে প্রতিদিন কর্মক্ষেত্রে বের হতেই হয়। লাল মিয়া আক্ষেপ করে বলেন যে, অতীতে ডিমের বাজারমূল্য কম থাকায় লাভের পরিমাণ বেশি হতো। কিন্তু বর্তমানে বাজারে ডিমের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় সকল জিনিসপত্রের মূল্য আকাশচুম্বী হওয়ায় এই সামান্য আয়ে সংসার চালানো অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে।