খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ৩১ জানুয়ারি ২০২৬
নব্বইয়ের দশকের ক্যাসেট ও সিডির যুগ পেরিয়ে শূন্য দশকের অ্যালবাম সংস্কৃতি, সেখান থেকে আজকের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম—বাংলা সংগীতের এই দীর্ঘ অভিযাত্রায় যাঁরা নীরবে কিন্তু দৃঢ়ভাবে পাশে ছিলেন, তাঁদের মিলনমেলাই যেন হয়ে উঠেছিল এক সন্ধ্যার কেন্দ্রবিন্দু। সংগীতশিল্পী, সুরকার, গীতিকার, প্রযোজক ও পর্দার আড়ালের কারিগরদের উপস্থিতিতে গান, স্মৃতি ও আবেগে মুখর হয়ে ওঠে পুরো আয়োজন। উপলক্ষ—দেশের অন্যতম সংগীত প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান গানচিল-এর দুই দশকের পথচলা উদ্যাপন।
এই ২০ বছর পূর্তির অনুষ্ঠানটি কেবল অতীত স্মরণে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং সংগীতকে সঙ্গী করে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ের প্রকাশ ছিল এটি। দীর্ঘ যাত্রাপথে অর্জিত অভিজ্ঞতাকে ভিত্তি করে নতুন লোগো, নতুন পরিকল্পনা ও বিস্তৃত পরিসরে পথচলার ঘোষণা দেয় গানচিল। অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয় প্রতিষ্ঠানটির নতুন মূলমন্ত্র—“উত্তরাধিকার কখনো অবসর নেয় না, সে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করে।”
২০০৫ সালের শেষ দিকে নকীব খান, কুমার বিশ্বজিৎ, আসিফ ইকবাল ও রেজা রহমানের উদ্যোগে যাত্রা শুরু করা গানচিল সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একটি পরিণত সংগীত প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়। বর্তমানে এককভাবে কর্ণধারের দায়িত্ব পালন করছেন আসিফ ইকবাল। দুই দশক পূর্তির এই আয়োজনে তাঁর উদ্যোগেই গানচিলের তিন প্রতিষ্ঠাতা—নকীব খান, কুমার বিশ্বজিৎ ও রেজা রহমান—সম্মাননা ক্রেস্ট গ্রহণ করেন। কানাডায় অবস্থান করায় কুমার বিশ্বজিৎ সরাসরি উপস্থিত থাকতে না পারলেও ভিডিও কলে যুক্ত হয়ে নিজের অনুভূতি ও কৃতজ্ঞতার কথা জানান।
সম্মাননা পর্বে তিন প্রতিষ্ঠাতার বক্তব্যে উঠে আসে গানচিলকে ঘিরে দীর্ঘ পথচলার স্মৃতি, সংগ্রাম ও ভালোবাসার গল্প। তাঁরা প্রতিষ্ঠানটির সাম্প্রতিক কার্যক্রমে সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং ভবিষ্যতের জন্য শুভকামনা জানান, যেন গানচিলের সংগীতযাত্রা আরও বিস্তৃত ও সমৃদ্ধ হয়।
সম্মাননা শেষে শুরু হয় মূল সাংস্কৃতিক আয়োজন। মঞ্চে গান পরিবেশন করেন কোনাল, সালমা, কিশোর, মাহাদি, দোলা, নিলয়, নাহিদ হাসান, তরিক মৃধাসহ একাধিক শিল্পী। তাঁদের কণ্ঠে ভেসে আসে গানচিল ব্যানারে প্রকাশিত আসিফ ইকবালের লেখা জনপ্রিয় গানগুলো, যা শ্রোতাদের স্মৃতিকে ফিরিয়ে নেয় বিভিন্ন সময়পর্বে।
মানসম্মত ও সুস্থ সংগীতচর্চার লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করা গানচিল শুরুতেই শ্রোতাদের উপহার দেয় ক্লোজআপ ওয়ান তারকা মেহরাব ও রুমির অ্যালবাম ‘আড্ডা’ ও ‘বিউটির চরণদাসী’। তবে ২০০৮–০৯ সালের দিকে পাইরেসির আগ্রাসন ও এফএম রেডিও সংস্কৃতির প্রভাবে অ্যালবাম বাজারে মন্দা দেখা দেয়। ২০১২ সালে অ্যালবাম প্রকাশ সাময়িকভাবে বন্ধ হলেও গানচিলের পথচলা থেমে থাকেনি। ২০১৫ সালের পর নতুন উদ্যমে আবার সক্রিয় হয় প্রতিষ্ঠানটি। অনুষ্ঠানের বিভিন্ন পর্বে সেই সংগ্রাম, টিকে থাকার গল্প ও নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়।
| সময়কাল | উল্লেখযোগ্য ঘটনা |
|---|---|
| ২০০৫ | গানচিলের যাত্রা শুরু |
| ২০০৬–২০০৮ | জনপ্রিয় অ্যালবাম প্রকাশ |
| ২০০৯–২০১২ | পাইরেসি ও বাজার সংকট |
| ২০১২ | অ্যালবাম প্রকাশ স্থগিত |
| ২০১৫–বর্তমান | নতুন উদ্যমে কার্যক্রম |
অনুষ্ঠানে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথাও জানান আসিফ ইকবাল। তাঁর ভাষ্যে, সামনে আসছে নাটক, ‘গানচিল অরিজিনালস’, নতুন গান এবং ‘পথের গল্প’ নামের ভিন্নধর্মী প্রকল্প, যেখানে অদেখা বাংলাদেশকে নতুন দৃষ্টিতে তুলে ধরা হবে।
আয়োজনের শেষ পর্বে প্রদর্শিত হয় কোনাল ও নিলয়ের গাওয়া নতুন গান ‘ও জান’-এর ভিডিও। গানটির কথা লিখেছেন আসিফ ইকবাল, সুর করেছেন আভ্রাল সাহির ও লিংকন, সংগীতায়োজনেও ছিলেন আভ্রাল সাহির। নেপালের মুস্তাং অঞ্চলের মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক প্রেক্ষাপটে নির্মিত এই ভিডিও দর্শকদের বিশেষভাবে মুগ্ধ করে। বড় পর্দায় গানটি প্রদর্শিত হলে করতালি ও উচ্ছ্বাসে ভরে ওঠে মিলনায়তন।
দুই দশকের এই আয়োজন শেষে স্পষ্ট হয়ে ওঠে একটি সত্য—গানচিল কেবল একটি সংগীত প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান নয়; এটি সময়, স্মৃতি ও উত্তরাধিকারের এক জীবন্ত সেতুবন্ধন, যা অতীতকে ধারণ করেই নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করে সামনে এগিয়ে যেতে জানে।