খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬
বাংলাদেশের ফুটবল অঙ্গনের এক অবিচ্ছেদ্য নাম মামুনুল ইসলাম। দীর্ঘ দুই দশকের এক গৌরবোজ্জ্বল ও বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের ইতি টানতে যাচ্ছেন জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক এই সফল অধিনায়ক। ২০২৬ সালের ১ মে, শুক্রবার কিংস অ্যারেনায় প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচে রহমতগঞ্জ মুসলিম ফ্রেন্ডস সোসাইটির বিপক্ষে ফর্টিস এফসির জার্সি গায়ে তিনি তার ক্যারিয়ারের শেষ প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচটি খেলবেন। ৩৭ বছর বয়সী এই অভিজ্ঞ মিডফিল্ডারের বিদায়ে দেশের ফুটবলের একটি সোনালী অধ্যায়ের অবসান ঘটছে।
মামুনুল ইসলামের ফুটবল যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০০৫ সালে ব্রাদার্স ইউনিয়নের মাধ্যমে। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। ঘরোয়া ফুটবলে তার সৃজনশীল পাসিং এবং সেট-পিসে দক্ষতার কারণে তিনি দ্রুতই কোচ ও সমর্থকদের নজর কাড়েন। তার ক্যারিয়ারের উল্লেখযোগ্য তথ্যাবলি নিচে তুলে ধরা হলো:
আন্তর্জাতিক অভিষেক: ২০০৮ সালে জাতীয় দলের হয়ে প্রথম মাঠে নামেন।
অধিনায়কত্ব: ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত টানা চার বছর অত্যন্ত দক্ষতার সাথে জাতীয় দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
জাতীয় দলের পরিসংখ্যান: লাল-সবুজ জার্সিতে তিনি মোট ৬৭টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন এবং ৩টি গোল করেছেন।
এসএ গেমস সাফল্য: ২০১০ সালে ঘরের মাঠে অনুষ্ঠিত এসএ গেমসে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২৩ দলের হয়ে স্বর্ণপদক জয় ছিল তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা মুহূর্ত।
ঘরোয়া সাফল্য: দেশের মোট ১১টি ভিন্ন ক্লাবের হয়ে খেলেছেন তিনি। এর মধ্যে শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাবের হয়ে তিনি তিনটি প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা এবং দুটি ফেডারেশন কাপ জয়ের কৃতিত্ব অর্জন করেন।
অবসরের ঘোষণা উপলক্ষে ৩০ এপ্রিল, ২০২৬ তারিখে ফর্টিস এফসির ক্লাব হাউসে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে দীর্ঘ ক্যারিয়ারের প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তি নিয়ে কথা বলেন এই ফুটবলার। মামুনুল বলেন, “ফুটবল আমাকে নাম, খ্যাতি, অর্থ এবং অসংখ্য ট্রফি দিয়েছে। আজ আমার পাওয়ার চেয়ে ফুটবলকে ফিরিয়ে দেওয়ার সময় এসেছে।” তার কণ্ঠে ছিল দীর্ঘ পথচলার তৃপ্তি, তবে পেশাদার খেলোয়াড় হিসেবে বিদায়বেলায় কিছুটা আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
অসংখ্য অর্জনের মাঝেও মামুনুল ইসলামের মনে দুটি গভীর আক্ষেপ রয়ে গেছে, যা তিনি সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্ট করেছেন:
১. সাফ শিরোপা জয়: দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্বের আসর ‘সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে’ ট্রফি জিততে না পারা মামুনুলের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ। দেশের ফুটবলের ক্রান্তিলগ্নে তিনি দলকে নেতৃত্ব দিলেও আঞ্চলিক এই শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করা সম্ভব হয়নি।
২. আইএসএল অভিজ্ঞতা: ২০১৪ সালে ভারতের জনপ্রিয় ঘরোয়া লিগ ‘ইন্ডিয়ান সুপার লিগ’ (আইএসএল)-এ অ্যাটলেটিকো ডি কলকাতা (এডিকে) দলে ডাক পেয়েছিলেন তিনি। সেই মৌসুমে তার দল এডিকে চ্যাম্পিয়ন হলেও, পুরো টুর্নামেন্টে মামুনুল একটি ম্যাচেও মাঠে নামার সুযোগ পাননি। শিরোপাজয়ী দলের সদস্য হওয়া সত্ত্বেও খেলার সুযোগ না পাওয়াকে তিনি তার ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় বড় আক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
খেলোয়াড়ী জীবনের ইতি টানলেও মামুনুল ইসলাম ফুটবল থেকে দূরে সরছেন না। ফুটবলের প্রতি তার আজন্ম টান তাকে মাঠের পাশেই রাখবে। তিনি ইতিমধ্যেই কোচিং পেশায় আসার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, তার ‘এ’ লাইসেন্সধারী কোচিং সার্টিফিকেট রয়েছে। কোচিংয়ের মাধ্যমে দেশের ফুটবলের মানোন্নয়নে এবং নতুন প্রজন্মকে গড়ে তুলতে তিনি কাজ করে যেতে চান। মামুনুল দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, ফুটবলই তার জীবন এবং এই অঙ্গন ছাড়া থাকা তার পক্ষে অসম্ভব।
মামুনুল ইসলাম কেবল একজন খেলোয়াড় ছিলেন না, বরং মাঠের ভেতরে ও বাইরে তিনি ছিলেন একজন নেতা। তার নিখুঁত লং পাস এবং কর্নার কিক থেকে গোল করার দক্ষতা অনেক জয়ে ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে মাঝমাঠে বলের নিয়ন্ত্রণ রাখার ক্ষমতায় তিনি ছিলেন সমসাময়িক ফুটবলারদের মধ্যে অনন্য। তার অবসরের মাধ্যমে বাংলাদেশের ফুটবল একটি নির্ভরযোগ্য নেতৃত্ব হারাল, তবে কোচ হিসেবে তার নতুন পথচলা দেশের ফুটবলকে ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে ক্রীড়া বিশ্লেষকরা মনে করেন।
আগামীকালের ম্যাচটি হবে এই কিংবদন্তির বিদায়ী সংবর্ধনা। ফর্টিস এফসি বনাম রহমতগঞ্জের এই ম্যাচটি কেবল লিগের পয়েন্ট তালিকার লড়াই নয়, বরং দেশের ফুটবলের একনিষ্ঠ সেবককে সম্মান জানানোর একটি মঞ্চ হয়ে থাকবে।