খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকিং খাতের তিন প্রতিষ্ঠানকে লভ্যাংশ প্রদানে ব্যর্থতার দায়ে সর্বনিম্ন ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে স্থানান্তর করা হয়েছে। এর মধ্যে দেশের বৃহত্তম বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি সরাসরি ‘এ’ ক্যাটাগরি থেকে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নেমে গেছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার এক আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মাধ্যমে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
বিএসইসি এবং ডিএসই-এর বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানি টানা দুই বছর বিনিয়োগকারীদের জন্য লভ্যাংশ (Dividend) ঘোষণা করতে ব্যর্থ হলে তাদের ক্যাটাগরি অবনমন করা হয়। এই সিদ্ধান্তের ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর শেয়ারদরে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, লভ্যাংশ প্রদানের সক্ষমতা ও ধারাবাহিকতা হারানোয় মোট তিনটি ব্যাংককে নিম্ন ক্যাটাগরিতে স্থানান্তর করা হয়েছে:
১. ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি: ব্যাংকটি এতদিন শীর্ষস্থানীয় ‘এ’ ক্যাটাগরিতে অবস্থান করছিল। কিন্তু টানা দুই অর্থবছর বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ দিতে না পারায় একে সরাসরি সর্বনিম্ন ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। ২. স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক লিমিটেড: এই ব্যাংকটি ‘বি’ ক্যাটাগরিতে অবস্থান করছিল। লভ্যাংশ প্রদানে ব্যর্থতার দায়ে একে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে স্থানান্তর করা হয়েছে। ৩. সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক: স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের মতো এই প্রতিষ্ঠানটিও ‘বি’ ক্যাটাগরি থেকে অবনমন পেয়ে ‘জেড’ ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
পুঁজিবাজারের নিয়ম অনুযায়ী, লভ্যাংশ প্রদানের পরিমাণ ও নিয়মিততার ওপর ভিত্তি করে কোম্পানিগুলোকে ‘এ’, ‘বি’, ‘এন’ এবং ‘জেড’—এই চার ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে ‘জেড’ ক্যাটাগরিকে সবচেয়ে দুর্বল এবং ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ডিএসই-এর নির্দেশনা অনুযায়ী, ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে স্থানান্তরের ফলে এই তিন ব্যাংকের শেয়ার লেনদেনের ক্ষেত্রে বেশ কিছু কঠোর বিধিনিষেধ তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়েছে:
মার্জিন ঋণ সুবিধা বন্ধ: এখন থেকে বিনিয়োগকারীরা ইসলামী ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক এবং সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংকের শেয়ার কেনার ক্ষেত্রে ব্রোকারেজ হাউস থেকে কোনো ধরনের মার্জিন ঋণ (Margin Loan) সুবিধা পাবেন না।
লেনদেনের সময়সীমা: সাধারণত ‘জেড’ ক্যাটাগরির শেয়ারগুলোর ক্ষেত্রে লেনদেন নিষ্পত্তির সময়সীমা (Settlement Cycle) পরিবর্তন হয়। এক্ষেত্রে ‘টি+৩’ (T+3) পদ্ধতিতে লেনদেন সম্পন্ন করতে হয়, যা বিনিয়োগকারীদের তাৎক্ষণিক ক্রয়-বিক্রয়ের সক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
বিনিয়োগ ঝুঁকি: বিশ্লেষকদের মতে, ‘জেড’ ক্যাটাগরি কোনো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দুর্বলতা ও সুশাসনের অভাবের ইঙ্গিত দেয়। এতে প্রাতিষ্ঠানিক ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা হ্রাস পায় এবং বড় ধরনের বিক্রয় চাপ তৈরি হয়।
ক্যাটাগরি অবনমনের সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে বৃহস্পতিবার লেনদেনের শুরু থেকেই ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারদরে নেতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে:
ইসলামী ব্যাংক: দিনের শুরুতে শেয়ারটির বাজারদর ছিল ৩৪ টাকা ৭০ পয়সা। সংবাদের প্রভাবে দুপুরের মধ্যেই দর ৫ শতাংশের বেশি কমে ৩৩ টাকা ১০ পয়সায় নেমে আসে।
অন্যান্য ব্যাংক: স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক এবং সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার ব্যাংকের শেয়ারদরেও সমজাতীয় নিম্নমুখী প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়েছে।
সাধারণত বিনিয়োগকারীরা ব্যাংকিং খাতের শেয়ারে স্থিতিশীলতা এবং নিয়মিত লভ্যাংশের আশা করেন। কিন্তু টানা দুই বছর মুনাফা বন্টনে ব্যর্থতা ব্যাংকগুলোর আর্থিক স্বাস্থ্যের ব্যাপারে বাজারে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) দীর্ঘদিন ধরেই দুর্বল পারফরম্যান্স করা কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে আসছিল। নিয়ম অনুযায়ী, কোনো কোম্পানি বার্ষিক সাধারণ সভা (AGM) করতে ব্যর্থ হলে বা লভ্যাংশ দিতে না পারলে তাদের ওপর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে ক্যাটাগরি পরিবর্তন করা হয়।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামী ব্যাংকের মতো একটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের ক্যাটাগরি অবনমন পুঁজিবাজারের সামগ্রিক সূচকেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ ব্যাংকিং খাতকে বাজারের অন্যতম শক্তিশালী স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। লভ্যাংশ না দেওয়ার কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া না গেলেও, ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ এবং তারল্য সংকটকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখছেন অনেকে।