এবিএম জাকিরুল হক টিটন
প্রকাশ: সোমবার, ২১ জুলাই ২০২৫
উত্তরার মাইলস্টোন স্কুলে বিমান বিধ্বস্ত হয়ে দগ্ধ শিশুরা হাসপাতালে লড়ছে জীবন-মরণের যুদ্ধে। এই ট্রাজেডির সময়ে হাসপাতালের চারপাশে চলছে ভিড়, হুড়োহুড়ি, ছবি তোলা আর লাইভ প্রচারের প্রতিযোগিতা। প্রশ্ন জাগে—এটি কি সহানুভূতির বহিঃপ্রকাশ, না এক ভয়ঙ্কর আত্মপ্রদর্শনের উদাহরণ?
ঘটনার পরপরই ঢাকাবাসী রক্তদানের জন্য ছুটে এসেছেন—এটি নিঃসন্দেহে মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত। কিন্তু সেই মানবিকতার স্রোতে যাঁরা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছেন, তাঁদের নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে।
উদ্ধারকাজে নিযুক্ত কর্মীরা বারবার অনুরোধ করেছেন, অতিরিক্ত ভিড় যেন না হয়। কারণ, এই ভিড়ই রোগী পৌঁছাতে দেরি করিয়েছে, অ্যাম্বুলেন্স আটকে গেছে, চিকিৎসা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। তবু কে শুনে কার কথা! হাসপাতালের গেটে ভিড়, কৌতূহলী দর্শনার্থী, সংবাদমাধ্যমের লাইভ সম্প্রচার—সব মিলিয়ে দুর্ঘটনা যেন হয়ে উঠেছে একরকম অডিয়েন্স বাড়ানোর ‘ইভেন্ট’।
এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক নেতাদের দলবেঁধে হাসপাতালে উপস্থিত হওয়া আরও আতঙ্কের। এই ঘটনা চরম বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করেছে। আদতে তাঁদের এই উপস্থিতি কি কোনো সহায়তা করেছে? নাকি তা কেবল রাজনৈতিক আবেগ দেখানোর বাহ্যিক প্রয়াস?
জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা স্বেচ্ছাসেবকের কথায় স্পষ্ট, ‘আমরা রোগী ঢুকাতে পারছি না, কারণ শত শত মানুষ ভেতরে যেতে চাইছে।’ একজন নারী চিকিৎসককে তো হাতজোড় করে অনুরোধ করতে হয়েছে—‘দয়া করে ভিড় করবেন না।’
চিকিৎসাবিজ্ঞানে পরিষ্কার বলা আছে, পোড়া রোগীর চারপাশে অতিরিক্ত ভিড় সংক্রমণের আশঙ্কা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। দগ্ধ রোগীর শরীর তখন জীবাণুর কাছে সবচেয়ে নাজুক। অথচ আমরা দেখছি, রাজনৈতিক নেতারা রোগীর শয্যার পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন, খবর নিচ্ছেন। আসলেই কি খবর নেওয়া প্রয়োজন ছিল? নাকি ছবি তুলে প্রচার করাই মুখ্য উদ্দেশ্য?
এই দৃশ্য নতুন নয়। মাগুরার একটি ধর্ষণের ঘটনার পরেও আমরা দেখেছি, কিভাবে রাজনৈতিক দলগুলো এক অসুস্থ শিশুর পাশে দাঁড়িয়ে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে ‘মানবিকতার অভিনয়’ করেছেন। তাঁদের উপস্থিতি সে সময়ও ছিল সমালোচিত, অপ্রয়োজনীয় এবং অমানবিক।
রাজনীতিবিদরা জনগণের প্রতিনিধি—এ কথা ঠিক। দুর্যোগে তাঁদের পাশে থাকা জরুরি—এ কথাও ঠিক। কিন্তু পাশে থাকা মানে যদি হয় বিশৃঙ্খলা তৈরি করা, তাহলে তা আর সহানুভূতি নয়, তা হয় দায়িত্বহীনতা।
দুর্যোগের মুহূর্তে রাজনীতি নয়, দরকার পেশাদারি সহানুভূতি। দায়িত্বশীলতা মানে সবাইকে আগে সাহায্য করতে দেওয়া, পেছনে দাঁড়িয়ে প্রয়োজনে পরামর্শ দেওয়া, দরকার হলে সহায়তা পাঠানো। ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে চোখ ভেজানো নয়।
আমরা এক ভয়ানক আত্মকেন্দ্রিক সমাজে পরিণত হচ্ছি, যেখানে সহানুভূতিও দেখাতে হয় প্রচারের মাধ্যমে। যেখানে অসহায় শিশুদের দগ্ধ শরীর নিয়ে হাহাকার চলছে, সেখানে নেতাদের ‘প্রেসার-মেকিং’ উপস্থিতি আসলে জনগণের উপকারে আসে না, বরং ক্ষতিই করে।
সাংবাদিকতা, নাগরিক সচেতনতা ও রাজনৈতিক আচরণ—সবখানেই জরুরি সংবেদনশীলতা। এখন সময় এসেছে আমাদের রাজনীতিকদের আত্মসমালোচনার। তাঁদের বুঝতে হবে, কাণ্ডজ্ঞানবিহীন উপস্থিতি কখনোই জনগণের ভালোবাসা এনে দেয় না, বরং ধিক্কারই বাড়ায়।
আমরা যদি সত্যিকারের মানবিক হতে চাই, তাহলে আলো নয়—ছায়া হতে শিখতে হবে। সহযোগিতা কখনোই হইচই করে হয় না, হয় নীরবে, নিরবচ্ছিন্নভাবে।
লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক, খবরওয়ালা