খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৩১ জুলাই ২০২৫
দেশজুড়ে খুন, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির লাগাম টানা যাচ্ছে না। প্রকাশ্যে মানুষ খুন হচ্ছে, আর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ পড়ে যাচ্ছে চাঁদাবাজদের করাল গ্রাসে। ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে শিক্ষক, শ্রমিক, এমনকি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরাও এই চাঁদাবাজির শিকার। ভয় আর নিরাপত্তাহীনতায় অনেকেই পুলিশের কাছেও অভিযোগ করতে সাহস পাচ্ছেন না, কারণ অভিযোগ করলেই হতে পারে প্রাণনাশ না হলে মব ভায়োলেন্স।
রাজধানীর গুলশানে ২৭ জুলাই রাতে ‘সমন্বয়ক’ পরিচয়ে চাঁদার টাকা নিতে আসা কয়েক তরুণ পুলিশের ফাঁদে আটক হওয়ার পর এই চক্রের নানা ভয়াবহ দিক সামনে আসে। জানা গেছে, শুধু চাঁদা আদায় নয়, চাহিদা না মেটালেই খুন করছে সন্ত্রাসীরা।
এই পরিস্থিতির প্রতিবাদে বিভিন্ন স্থানে রাস্তায় নেমে এসেছে সাধারণ মানুষ। ঝিনাইদহ, সাভার, চট্টগ্রাম, মিরসরাই, মোহাম্মদপুর, ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষক, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, পরিবহনশ্রমিক, ব্যবসায়ীসহ নানা পেশার মানুষ মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছে।
গত এক বছরে দেশে হত্যা মামলার সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত দেশে তিন হাজার ৮৫৭টি হত্যা মামলা হয়েছে। গড়ে প্রতিমাসে ২৮৮টি। এর মধ্যে শুধু ঢাকা রেঞ্জেই হয়েছে ৯০৩টি মামলা। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ে গড়ে ২৫৬টি মামলা হলেও পরবর্তী এক বছরে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮৮টিতে।
রাজধানীতে সংঘটিত ছয় মাসের ২১৭টি হত্যাকাণ্ড বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, অধিকাংশই ঘটেছে রাজনৈতিক বিরোধের কারণে। পুরান ঢাকার মিটফোর্ড এলাকায় প্রকাশ্যে ব্যবসায়ী সোহাগ ওরফে লাল চাঁদকে হত্যাসহ বাড্ডা, মিরপুর, গুদারাঘাট এলাকায় একের পর এক হত্যাকাণ্ড আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, এই ক্রমবর্ধমান সহিংসতা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির বড় অবনতি নির্দেশ করে। পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু তৎপরতা থাকলেও তা দৃশ্যমান ফল দিচ্ছে না। ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেন, সব ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কাজ চলছে। পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি ইনামুল হক জানিয়েছেন, প্রতিটি হত্যার তদন্ত হচ্ছে এবং অপরাধীদের ধরার চেষ্টা চলছে।
তবে জনসাধারণের অভিযোগ, এই কার্যক্রম যথেষ্ট নয়। মোহাম্মদপুর-আদাবরে ৭০টির বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থী চাঁদাবাজির প্রতিবাদে রাস্তায় নামে। সাভারের বিরুলিয়ায় চার শতাধিক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী একই ইস্যুতে মানববন্ধন করে।
চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে মাছ চাষ প্রকল্পে চাঁদা না দিলে মাছ চুরি, বিষ প্রয়োগ বা উৎপাদনে বাধা দেওয়া হচ্ছে। ময়মনসিংহে একটি বেসরকারি হাসপাতালের মালিককে চাঁদা না দেওয়ায় মারধর ও ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে। আশুলিয়ায় সাধারণ ব্যবসায়ী ও পরিবহন শ্রমিকরাও একত্রে মানববন্ধন করে চিহ্নিত চাঁদাবাজদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানান।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নেওয়া হয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা দেশব্যাপী চাঁদাবাজদের তালিকা তৈরি করছে, যার আওতায় শিগগিরই গ্রেপ্তার অভিযান চালানো হবে।
তবে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—শুধু ঘোষণা নয়, কার্যকর পদক্ষেপ কবে আসবে? আইন-শৃঙ্খলার এই সংকট যদি দ্রুত সমাধান না হয়, তাহলে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস আর খুনের এই চক্র থামানো দুঃসাধ্য হয়ে উঠবে।
খবরওয়ালা/এমএজেড