খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬
ক্ষমতায় পরিবর্তনের পর অল্প সময়ের মধ্যেই সরকারের ব্যাংক ঋণ গ্রহণে নজিরবিহীন বৃদ্ধি দেখা দিয়েছে। সর্বশেষ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, দেড় মাসের ব্যবধানে ব্যাংক খাত থেকে সরকার প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের ঘাটতি ও চলমান ব্যয় মেটাতে বাধ্য হয়েই এই ঋণনির্ভরতা বাড়ছে, যা দেশের সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগজনক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত মাত্র তিন মাসে সরকারের মোট ব্যাংক ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকায়। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত সময়, যখন একাই নেওয়া হয়েছে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ অল্প সময়ের ব্যবধানে ঋণ গ্রহণের গতি বহুগুণ বেড়ে গেছে।
| সময়কাল | ব্যাংক ঋণের পরিমাণ |
|---|---|
| গত ৬ মাস | তুলনামূলক কম (প্রবণতা ভিত্তিক অনুমান) |
| জানুয়ারি–মার্চ | প্রায় ৫৬,০০০ কোটি টাকা |
| ১৬ ফেব্রুয়ারি–৩১ মার্চ | প্রায় ৪১,০০০ কোটি টাকা |
| গত ১৪ মাসে মোট বৃদ্ধি | প্রায় ১.৭৫ লাখ কোটি টাকা |
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি তথ্য বলছে, গত ১৪ মাসে সরকারের ব্যাংক ঋণ প্রায় পৌনে দুই লাখ কোটি টাকা বেড়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে তা ভবিষ্যতে ঋণঝুঁকি ও আর্থিক ভারসাম্যহীনতা তৈরি করতে পারে।
অর্থনীতির মূল চাপে রয়েছে রাজস্ব আদায় ও সরকারি ব্যয়ের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ব্যবধান। অর্থবছরের প্রথম আট মাসে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার কাছাকাছি। অন্যদিকে সরকারি ব্যয় কমেনি, বরং নিত্যপ্রয়োজনীয় খাত, উন্নয়ন প্রকল্প এবং জ্বালানি আমদানি ব্যয় মেটাতে চাপ আরও বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য ওঠানামা, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আমদানি ব্যয়ের বৃদ্ধি এই চাপকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, অতিরিক্ত ব্যাংক ঋণ দেশকে ধীরে ধীরে ঋণ ফাঁদের দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাঁর মতে, সরকারের উচিত রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ জোরদার করা।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যয় মেটানো ও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চাপ থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের ঋণনির্ভরতা অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ব্যবসায়ী নেতারাও এই পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছেন।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়া শেষ পর্যন্ত অর্থনীতিকে দুর্বল করে ফেলে। তাঁর মতে, এই ঋণের বোঝা ভবিষ্যতে সরকার ও অর্থনীতি উভয়ের জন্য চাপ সৃষ্টি করবে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, বর্তমানে ব্যাংক খাতে তীব্র তারল্য সংকট চলছে। প্রায় ২৩টি ব্যাংকে বড় ধরনের মূলধন ঘাটতি রয়েছে, যার পরিমাণ প্রায় ২ লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকা। ফলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের ব্যাংক ঋণ বাড়তে থাকলে বেসরকারি খাতে ঋণ পাওয়ার সুযোগ সংকুচিত হবে। এতে নতুন বিনিয়োগ কমে যেতে পারে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ধীর হয়ে যেতে পারে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
একই সঙ্গে বাজারে তারল্য চাপ বাড়লে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করাও আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হবে।
সব মিলিয়ে, সরকারের ব্যাংক ঋণের এই দ্রুত ও রেকর্ড বৃদ্ধি দেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত। স্বল্পমেয়াদে ব্যয় মেটাতে এটি সহায়ক হলেও দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব বৃদ্ধি, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি ছাড়া এই পরিস্থিতি টেকসই হবে না বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।