খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ৬ ডিসেম্বর ২০২৫
চট্টগ্রামে এক দিনমজুরকে ‘বিত্তশালী ব্যবসায়ী’ ভেবে অপহরণ ও মুক্তিপণ দাবি করার ঘটনা নতুন করে আলোচনায় এনেছে আর্থসামাজিক বৈষম্য এবং অপরাধীচক্রের টার্গেট নির্বাচনের কৌশল নিয়ে প্রশ্ন। নোয়াখালীর সেনবাগের বাসিন্দা ও পেশায় দিনমজুর নাজিম উদ্দিনকে গত রবিবার রাতে অপহরণের পর তাকে নির্যাতন করে দাবি করা হয় সাড়ে তিন লাখ টাকা। পরে পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে র্যাবের অভিযানে তাকে জীবিত উদ্ধার করা হয় এবং গ্রেফতার করা হয় দুই অপহরণকারীকে।
নাজিম উদ্দিন প্রতিদিনের মতো কাজের সন্ধানে বাসা থেকে বেরিয়ে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির মাইজভাণ্ডার দরবার শরিফে যান। রাত সাড়ে ১২টার দিকে তিনি সিএনজি অটোরিকশায় মোহাম্মদনগরের ভাড়া বাসায় ফিরছিলেন। গাড়িটি হাটহাজারীর সরকার হাট বাজার এলাকায় পৌঁছালে আজম ও তার সহযোগীরা গাড়ির গতিরোধ করে তাকে জোরপূর্বক নামিয়ে ফেলে।
অপহরণকারীরা দাবি করে, তারা ভেবেছিলেন নাজিম কোনো ব্যবসায়ী বা ধনী ব্যক্তি। তাকে একটি কক্ষে আটকে মারধর করা হয় এবং ওই নির্যাতনের ছবি তুলে নাজিমের স্ত্রীর কাছে ইমোর মাধ্যমে পাঠানো হয়। প্রথমে পাঁচ লাখ টাকা দাবির পর ‘দিনমজুর’ হওয়ায় কথায় কথায় তা কমিয়ে সাড়ে তিন লাখ টাকা চাওয়া হয়, কিন্তু তার পরিবার এত বড় অঙ্কের টাকা দিতে ব্যর্থ হলে মারধরের মাত্রা আরও বাড়ানো হয়।
নাজিমের স্ত্রী চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। বিষয়টি গোয়েন্দা নজরে আসার পর র্যাব-৭ তথ্য যাচাই করে অপহরণচক্রের সন্ধানে অভিযানে নামে। গত বৃহস্পতিবার রাতে নজুমিয়া হাট এলাকায় অপহৃত নাজিমকে একটি গাড়িতে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার সময় দুর্বৃত্তদের হাতেনাতে ধরে ফেলে র্যাব সদস্যরা।
গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলেন—আজম এবং আবু সামা। র্যাব জানায়, এ চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকায় অসহায় যাত্রীদের টার্গেট করে মুক্তিপণের জন্য অপহরণ করে আসছিল। তাদের বিরুদ্ধে আগেও একাধিক অভিযোগ রয়েছে।
উদ্ধার হওয়া নাজিম উদ্দিন জানান, তাকে গাড়ি থেকে নামানোর সঙ্গে সঙ্গে তিনি চিৎকার দিলে অপহরণকারীরা তাকে ‘গাড়িচোর’ বলে কেলেঙ্কারি সৃষ্টি করে জোরপূর্বক টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যায়। তারা বারবার তার দিনমজুর পরিচয় বিশ্বাস করতে চায়নি। বরং তাকে একটি প্রভাবশালী বা অর্থবান ব্যক্তি ভাবছিল। সে কারণে নির্যাতনের মাত্রা বাড়তে থাকে।
নাজিম বলেন, “আমি বারবার বলেছি আমি দিনমজুর, এত টাকা কোথা থেকে দেব। কিন্তু তারা বিশ্বাস করেনি। বরং ব্যবসায়ী ভেবে আরও জোরে মারধর করেছে।”
এই ঘটনার বিশ্লেষণে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর নজরদারির অভাবের সুযোগ নিয়ে অনেক চক্র যাত্রী বা পথচারীদের শুধু বাহ্যিক চেহারা দেখে টার্গেট করে। সিএনজি বা প্রাইভেট পরিবহন ব্যবস্থার নিরাপত্তা দুর্বল হওয়ায় রাতের বেলায় অপরাধীরা সহজেই যাত্রীদের আলাদা করে ফেলে।
বিশেষজ্ঞরা এটাও মনে করিয়ে দেন যে, দিনমজুরদের আর্থিক দুর্বলতা এমন পরিস্থিতিতে তাদের আরও ঝুঁকিতে ফেলে, কারণ মুক্তিপণ দেওয়ার সামর্থ্য না থাকায় নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যায় এবং ফলে জীবনের ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পায়।
র্যাব বলেছে, চক্রটির বাকি সদস্যদের ধরতে অভিযান অব্যাহত থাকবে। তবে সাধারণ মানুষ মনে করছেন—এই ঘটনা শুধু ব্যক্তি অপহরণের সমস্যা নয়, বরং সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতার প্রতিফলন।
এই ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন—যদি একজন সাধারণ দিনমজুরকে ‘ধনী’ ভেবে অপহরণ করা যায়, তাহলে যে কেউ এমন অপরাধের শিকার হতে পারে।