খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 8শে মাঘ ১৪৩২ | ২১ই জানুয়ারি ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
রাজধানীর বেসরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক’ (ইউএপি) কর্তৃপক্ষের এক নজিরবিহীন সিদ্ধান্তে উত্তাল হয়ে উঠেছে উচ্চশিক্ষা অঙ্গন। তথাকথিত ‘ধর্ম অবমাননার’ অভিযোগে শিক্ষার্থীদের তীব্র বিক্ষোভের মুখে দুই শিক্ষককে বহিষ্কার এবং তার মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সোমবার (১৯ জানুয়ারি, ২০২৬) বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের জরুরি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়, যা নিয়ে শিক্ষক সমাজ ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনার মূলে রয়েছে গত ১০ ডিসেম্বর শিক্ষক লায়েকা বশীরের একটি ফেসবুক পোস্ট। সেখানে তিনি মুখ ঢেকে পর্দা করার সংস্কৃতি নিয়ে ব্যক্তিগত মতপ্রকাশ করেছিলেন। পরবর্তীতে এই পোস্টটিকে ‘ধর্ম অবমাননা’ হিসেবে অভিহিত করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হয়। এর জেরে গত ১৮ জানুয়ারি নতুন সেমিস্টারের প্রথম দিনেই একদল বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন, সংবাদ সম্মেলন এবং অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। শিক্ষার্থীদের একাংশের দাবি, সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা বিভিন্ন সময়ে ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য দিয়েছেন। অন্যদিকে, অভিযুক্ত শিক্ষকরা একে ‘পরিকল্পিত মব জাস্টিস’ বা গণ-নিপীড়ন হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
পরিস্থিতি সামাল দিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনো দীর্ঘমেয়াদী তদন্ত বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ ছাড়াই অভিযুক্ত দুই শিক্ষককে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয়। রেজিস্ট্রার স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে ব্যাসিক সায়েন্স অ্যান্ড হিউম্যানিটিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক লায়েকা বশীর এবং একই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. এ এস এম মহসিনকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
ঘটনার সংক্ষিপ্ত ঘটনাক্রম ও বর্তমান চিত্র:
| তারিখ | ঘটনার বিবরণ | ফলাফল |
| ১০ ডিসেম্বর, ২০২৫ | শিক্ষক লায়েকা বশীরের ফেসবুক পোস্ট। | বিতর্কের সূত্রপাত। |
| ১৮ জানুয়ারি, ২০২৬ | ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের ব্যাপক বিক্ষোভ ও অবস্থান। | প্রশাসনের জরুরি সভা। |
| ১৮ জানুয়ারি (সন্ধ্যা) | দুই শিক্ষককে বহিষ্কারের ঘোষণা। | প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ। |
| ১৯ জানুয়ারি, ২০২৬ | অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা। | শিক্ষা কার্যক্রম স্থবির। |
| প্রতিক্রিয়া | বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের নিন্দা। | প্রশাসনের ভূমিকার সমালোচনা। |
বহিষ্কৃত দুই শিক্ষক এই সিদ্ধান্তকে ‘নিপীড়নমূলক’ এবং ‘স্বেচ্ছাচারী’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। লায়েকা বশীর দাবি করেছেন, তাঁর পোস্টটি ছিল কেবল একটি সামাজিক বিষয়ের সমালোচনা, যার সাথে ধর্ম অবমাননার কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, তাঁকে তাঁর বক্তব্য উপস্থাপনের কোনো সুযোগ না দিয়েই চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। সহযোগী অধ্যাপক ড. মহসিনও একই ধরনের অভিযোগ তুলে বলেছেন, এটি একটি ভয়ংকর নজির হয়ে থাকবে যেখানে শিক্ষক সমাজ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতির সংবেদনশীলতা এবং ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই তাঁরা দ্রুত এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন। তবে এই পদক্ষেপকে ‘মব চাপের’ কাছে আত্মসমর্পণ হিসেবে দেখছেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদরা। ‘বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক’ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তদন্ত কমিটির চূড়ান্ত রিপোর্টের আগেই এভাবে শিক্ষকদের বহিষ্কার করা মুক্তবুদ্ধি চর্চার পরিপন্থী এবং প্রশাসনিক অদূরদর্শিতার প্রমাণ।
বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণার পর সাধারণ শিক্ষার্থীরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। সেমিস্টারের শুরুতে এমন স্থবিরতা একাডেমিক ক্যালেন্ডারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সকল ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত থাকবে।
ধর্মীয় অনুভূতি এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার দ্বন্দ্বের মাঝে ইউএপি-র এই ঘটনাটি বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রশাসনের এই সিদ্ধান্ত কি সাময়িক শান্তি আনবে নাকি ভবিষ্যতের জন্য একটি বিতর্কিত দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে, তা এখন বড় আলোচনার বিষয়।